… ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে কেউ কথা বলে না। অথচ এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত। ১৯৭৪ সালের পর রাষ্ট্র বদলে গিয়েছিল। অনেক বছর ধরে মানুষ ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে কথা বলেনি। কারণ, এ ইতিহাসকে মনে করা হতো রাজনৈতিকভাবে মারাত্মক রকম ‘স্পর্শকাতর’। … শেখ মুজিব জাতিসংঘের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, এই দুর্ভিক্ষ তাঁর বৈধতার অবসান ঘটাবে। দুর্ভিক্ষ ছিল আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণগুলোর মধ্যে একটি। এ ছাড়া দুর্নীতি, রক্ষীবাহিনীর বর্বরতা, নেতৃত্বের ঔদ্ধত্য এবং নাগরিক স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে জনরোষ তো ছিলই। দুর্ভিক্ষ হয়তো অন্যতম একটি বিষয়, যে কারণে ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জনগণের মধ্যে কোনো রকমের শোক দেখা যায়নি
… যে খাদ্য, সাহায্য দেশে এসেছিল, তা শহরের বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, সরকারি কর্মচারী এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত অন্যান্যের কাছেই পৌঁছেছিল। বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন গ্রামীণ ভূমিহীন দরিদ্র মানুষেরা অন্যরা নেওয়ার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকত, তাদের ভাগ্যে সেটিই জুটত। সেই সময় এমনকি মধ্যবিত্তরাও প্রচণ্ড কষ্টে ছিল; কিন্তু তারা হাজারে হাজারে মারা যায়নি। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন সেই সময়, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন নিম্নবিত্ত। তাদের বেদনা ও যন্ত্রণা সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি।
… ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ অনেক। তবে মহিউদ্দিন আলমগীরের ফেমিন ইন সাউথ এশিয়া এবং রেহমান সোবহানের পলিটিকস অব ফুড এন্ড ফেমিন সহ কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে চারটি ব্যাখ্যা প্রধান বলে বিবেচিত হতে পারে। প্রথমত, ভয়াবহ বন্যায় ফসল ধ্বংস হয়েছিল। মজুরির বিনিময়ে যে শ্রমের বাজার, তাও বিপর্যস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তেল রপ্তানিকারী দেশগুলোর সংস্থার (ওপেক) তেলের মূল্য বৃদ্ধিজনিত সংকট, মজুতদারি, চোরাচালান এবং স্থানীয় খাদ্যঘাটতির কারণে মুদ্রাস্ফীতি গিয়েছিল বেড়ে। তৃতীয়ত, খাদ্যসাহায্য ব্যবহৃত হয়েছিল বাজেট সহায়তা এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতনের জন্য। দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার জন্য সে সময় যা বরাদ্দ করা হয়েছিল, তা ছিল খুবই সামান্য।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশ কমিউনিস্ট রাষ্ট্র কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য করেছে এই অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র এক বছরের জন্য খাদ্যসাহায্য আটকে রেখেছিল। এই চার কারণের সম্মিলিত প্রভাবে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয় নিয়ে আসে। দুর্ভিক্ষের কারণগুলো হয়তো স্পষ্ট; কিন্তু এর প্রভাব কী ছিল? সন্দেহ নেই যে দুর্ভিক্ষের ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জনগণের অসন্তোষ এবং হতাশা বেড়েছিল ব্যাপকভাবে। পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামরিক অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করতে গেলেও এই দুর্ভিক্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। দুর্ভিক্ষ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সরকার আন্তর্জাতিক দাতাদের চাপের মুখে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে এবং অর্থনীতিকে বাজারমুখী করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই দুর্ভিক্ষ খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়ে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উন্মোচন করেছিল। শস্যবাজারে আরও স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি সবচেয়ে দরিদ্রদের জন্য সহায়তাও দেওয়া হয়। সেই থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে।
… ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ দেখিয়ে দিয়েছিল যে মানুষের ন্যূনতম জীবনযাত্রার সংকটের রাজনৈতক মূল্য কতটা চড়া হতে পারে। কোনো বৈধ সরকারই দীর্ঘ সময় ধরে জনগণের জীবনযাত্রার মানের চরম অবনতি সহ্য করতে পারে না। এটিই ১৯৭৪ সালের অন্যতম শিক্ষা। এই শিক্ষাই সাম্প্রতিক অতীতের আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সাল থেকে চলমান লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারত। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁরা হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন, ‘যদি জনগণ অনাহারে থাকে, তবে ক্ষমতায় আপনার দিন গোনা শুরু হয়ে যায়।’
প্রথম আলো থেকে সংক্ষেপিত।


