এক সময় মানুষের ঘর বানানো মানেই ছিল দিনভর ইট, বালু, রড ও সিমেন্টের শব্দ। গরমে-ধুলোয় জর্জরিত নির্মাণশ্রমিকদের ধৈর্য আর ঘামে দাঁড়িয়ে যেতো একেকটি চার দেয়ালের স্বপ্ন। কিন্তু যদি বলা হয়, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় একেকটি পূর্ণাঙ্গ বসতবাড়ি গড়ে উঠছে কোনো মানুষ ছাড়াই, কোনো ইট ছাড়াই—তবে সেটা কি কল্পবিজ্ঞান মনে হয়? না, এটাই বর্তমান বাস্তবতা। ৩ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ঘর নির্মাণের দুনিয়ায় এমন এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যা আবাসন চিন্তাকে আমূল বদলে দিতে শুরু করেছে।
৩ডি প্রিন্টিং বলতে অনেকেই বুঝেন ছোট কোনো বস্তু একটি খেলনা কিংবা প্রোটোটাইপ, ছাপানো যন্ত্রে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তিই যখন আকারে বাড়ে এবং প্রিন্টারটি হয়ে যায় বিশাল এক রোবোটিক কাঠামো, তখন সেটি একটি ঘরও তৈরি করে ফেলতে পারে। এই ঘর ‘তৈরি’ হয় না, বরং ‘ছাপা’ হয় ঠিক বই ছাপার মতোই, শুধু কাগজ নয়, এখানে ছাপা হয় কংক্রিট বা বিশেষ মিশ্রণ। এই কাজের পেছনে থাকে এক জটিল সফটওয়্যার Computer-Aided Design (CAD)। আর্কিটেক্ট যেভাবে ঘরের নকশা কাগজে আঁকেন, CAD সফটওয়্যারে সেই নকশা ডিজিটালি তৈরি করা হয়। এরপর বিশেষ ৩ডি প্রিন্টার সেই ডিজাইন অনুযায়ী এক স্তর করে নির্মাণ উপাদান বসাতে থাকে, যতক্ষণ না দেয়াল দাঁড়িয়ে যায়, জানালা তৈরি হয়, দরজার জায়গা খালি থাকে।
এই ঘর তৈরির জন্য সাধারণ সিমেন্ট ব্যবহার করা যায় না। কারণ ৩ডি প্রিন্টিংয়ে উপকরণটিকে খুব দ্রুত শুকাতে ও জমতে হয়, যেন পরবর্তী স্তর বসাতে বিলম্ব না হয়। এজন্য তৈরি হয়েছে বিশেষ ধরনের ফাস্ট-ড্রাইং কংক্রিট মিক্সচার। এটি শক্ত, টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য।প্রিন্টারটি দেখতে অনেকটা বিশালাকৃতির গ্যান্ট্রি সিস্টেম বা রোবোটিক বাহুর মতো। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিজাইন পড়তে পারে এবং প্রিন্ট করতে পারে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে। কোন অংশে কতটা উপাদান দরকার, কোথায় ফাঁকা রাখতে হবে, এসব কিছুই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত।
একটি ৩ডি প্রিন্টিং হাউস নির্মাণে সময় লাগে গড়ে ২৪–৪৮ ঘণ্টা। আর খরচ? সাধারণ পদ্ধতিতে একই আকৃতির ঘর বানাতে যেখানে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়, সেখানে এই প্রযুক্তিতে সেটা অর্ধেক বা তারও কমে এসে দাঁড়ায়। শ্রমিক লাগবে না, কাঠামো অনেক সহজ এবং অপচয় প্রায় নেই বললেই চলে। এক কথায়, ৩ডি প্রিন্টিং ভবিষ্যতের সেই নির্মাণ পদ্ধতি, যা ব্যয়ের বোঝা কমাবে এবং সময় বাঁচাবে। বিশেষত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ঘর বানাতে এই প্রযুক্তির বিকল্প নেই।
বিশ্বজুড়ে এই প্রযুক্তি পরীক্ষিত ও প্রমাণিত। যুক্তরাষ্ট্রের ICON নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালে টেক্সাসে গড়ে তোলে “Village of the Future” নামে একটি সম্পূর্ণ ৩ডি প্রিন্টেড আবাসন এলাকা। রাশিয়ার Apis Cor মাত্র ২৪ ঘণ্টায় একটি ৪০০ বর্গফুটের ঘর বানিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়ে। ভারতের চেন্নাই শহরে ইতোমধ্যে সরকারি উদ্যোগে ৩ডি প্রিন্টেড ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। আরব আমিরাতে ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি দপ্তরের ২৫% ভবন ৩ডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে গড়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে এখনো এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্কিটেকচার ফার্ম এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এগিয়ে এসেছে।
৩ডি প্রিন্টিং হাউস কেবল দ্রুত ও সাশ্রয়ী নয়, এটি পরিবেশবান্ধবও। অপচয় নেই বললেই চলে, ব্যবহার হয় কম সিমেন্ট ও জল, এবং কার্বন নিঃসরণ হয় অনেক কম। ভবিষ্যতের নির্মাণ যখন টেকসই হতে হবে, তখন এই প্রযুক্তি হয়ে উঠবে আবশ্যক।
চ্যালেঞ্জ কোথায়?
তবে এই প্রযুক্তির বড় চ্যালেঞ্জ এর শুরুতেই। প্রযুক্তি আমদানির খরচ এখনো অনেক বেশি। দক্ষ অপারেটর ও সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞের ঘাটতি রয়েছে।আইনি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড এখনো নির্ধারিত নয় অনেক দেশে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বাধাগুলো দূর হওয়া সময়ের ব্যাপার। প্রযুক্তি যত সহজলভ্য হবে, ততই এটি গণমানুষের নাগালে আসবে।


