রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল শুরু হয় দুই দিনব্যাপী ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘স্বাস্থ্য ও কৃষিতে জৈবপ্রযুক্তি’।সম্মেলনের স্লোগান ছিল “টেকসই স্বাস্থ্য ও কৃষির জন্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকার”, এটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল নেটওয়ার্ক অব বাংলাদেশী বায়োটেকনোলজিস্টস যৌথভাবে আয়োজন করে।
সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ক্যান্সার এখন শতাব্দীর এক অব্যাহত চিকিৎসা চ্যালেঞ্জ। ডা. তাসনিম আরা জানান, ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১১ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্যান্সার মূলত জেনেটিক অস্থিতিশীলতার কারণে হয়। এই অস্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটায় এবং ম্যালিগন্যান্ট কোষে রূপান্তরিত করে।ফলে কোষগুলো শরীরের স্বাভাবিক কোষের মতো আচরণ না করে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে থাকে এবং আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে। এ জেনেটিক পরিবর্তন ডিএনএ, আরএনএ বা প্রোটিন স্তরে ঘটতে পারে এবং এর পেছনে জিনগত, পরিবেশগত ও জীবনযাত্রার কারণগুলো একত্রে কাজ করে।
ডা. তাসনিম আরা আরও জানান, ক্যান্সার নিরাময়ে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করছে। এই পদ্ধতিগুলো রোগীর নির্দিষ্ট জেনেটিক প্রোফাইল অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সক্ষম, যা নির্ভুলতা বাড়ায় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমায়।
সম্মেলনের আরেকটি বৈজ্ঞানিক আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নাদিম মাহমুদ লিকুইড বায়োপসির মাধ্যমে ক্যান্সার নির্ণয়ের আধুনিক পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, রক্ত বা মূত্রের নমুনা থেকে ক্যান্সার শনাক্ত করা সম্ভব, যা রোগীর জন্য অনেক সহজ ও কম আঘাতপূর্ণ। বিশেষ করে মূত্রথলি ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রচলিত সিস্টোস্কোপি অস্বস্তিকর হলেও লিকুইড বায়োপসি রোগীর জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এটি রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতা বাড়ায় এবং চিকিৎসায় দ্রুততা আনে।
সম্মেলনে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বৃদ্ধির সমস্যা নিয়েও সতর্ক করা হয়। বক্তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এর সমাধানে ব্যাকটেরিয়াফেজ উৎপন্ন এন্ডোলাইসিন প্রতিশ্রুতিশীল বিকল্প হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি নির্দিষ্ট জীবাণু ধ্বংস করতে সক্ষম এবং জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জ নিয়েও বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আনোয়ারুল আবেদীন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা ও লবণাক্ততা বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। উত্তরাঞ্চলে খরার কারণে মাটির আর্দ্রতা কমছে, ফলে ফসলের ফলন কমছে। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রস্তরের বৃদ্ধি ও জোয়ার প্রবেশ মাটির লবণাক্ততা বাড়াচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফসলের খরা ও লবণাক্ততা সহনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আলিমুল ইসলাম বলেন, এই সমস্যা মোকাবেলায় রোগ নির্ণয়, ভেটেরিনারি ও মৎস্য স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল লতিফ, জিএনওবিবির সভাপতি অধ্যাপক জেবা ইসলাম সিরাজ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আবিদুর রহমান এবং মাল্টিমোড গ্রুপের সিইও আবদুল আউয়াল মিন্টু। সম্মেলনের দিনব্যাপী বিভিন্ন সেশনে দেশ-বিদেশের গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা ক্যান্সার, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ, কৃষি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈবপ্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনের আলোচনাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের জনসংখ্যার ১১ শতাংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটা গুরুতর এবং তা মোকাবেলায় জৈবপ্রযুক্তি, নির্ভুল চিকিৎসা ও কৃষি প্রযুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম।


