বাংলাদেশের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পেয়েছে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের তুলনায় মাত্র ৫০১ কোটি টাকা বাড়লেও, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বিশাল চাহিদার তুলনায় এই বরাদ্দ ‘খুবই অপ্রতুল’ বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি মনে করেন বাজেটে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে।
স্বাস্থ্য বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ড. হামিদ বলেন, “জাতীয় বাজেট শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, নীতি-পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার প্রতিফলন।” তার মতে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের এই সামান্য বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিলেও, দেশের বাস্তব চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, “গত বছরও বাজেটের প্রায় অর্ধেক অব্যবহৃত থেকে গেছে। ফলে এবারের বাজেট কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে”।
বাজেটের গঠন ও অগ্রাধিকার নিয়ে বিশ্লেষণে উঠে আসে, উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় পরিচালন বাজেটে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়, জনবল সংকট এখন স্বাস্থ্য খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা। হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট সব স্তরেই শূন্য পদ রয়েছে। বাজেটে বিশেষ বিসিএস ও জরুরি নিয়োগের উদ্যোগকে ইতিবাচক বলে উল্লেখ করেন ড. হামিদ, তবে বাস্তবায়নের গতি ও দক্ষতা নিয়ে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
নতুন প্রকল্প গ্রহণে স্থবিরতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগের ঘাটতির কথাও উঠে আসে তার বক্তব্যে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চলমান প্রকল্পে বরাদ্দ অব্যাহত থাকলেও, নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন ছিল বলে তিনি মনে করেন।
জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশে বাজেটের কতটা প্রতিফলন ঘটেছে এ প্রশ্নে ড. হামিদ বলেন, কমিশন স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বাজেট তৈরির সময়ের কারণে এসব সুপারিশ পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। তবে জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত নিয়োগের উদ্যোগকে কমিশনের সুপারিশের আংশিক প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য বাজেট বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসে প্রশাসনিক জটিলতা, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, অনুপযোগী ক্রয়নীতি, অডিট ভীতি, বিপুল শূন্য পদ, প্রকল্প পরিচালনায় দক্ষতার অভাব ও দুর্নীতি। এসব কারণে বাজেটের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায় এবং কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।
সমাধান হিসেবে ড. হামিদ স্বাস্থ্য খাতের জন্য আলাদা সার্ভিস গঠন, ম্যানেজারিয়াল দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য উপযোগী ক্রয়নীতি ও নমনীয় অডিট ব্যবস্থা, স্থায়ী জনবল নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে বাজেটের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীন হবে এবং উন্নত চিকিৎসা সবার কাছে পৌঁছাবে। শেষ পর্যন্ত বাজেট যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে জনগণের সেবায় বাস্তবায়িত হয়, এটাই সবার প্রত্যাশা।


