২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট- বৈষম্যহীন অর্থনীতি সংকোচনমূলক কৌশল ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটটি পেশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, যা এই সরকারের প্রথম বাজেটও বটে। এটি উপস্থাপিত হয়েছে অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতা ও রাজনৈতিক উন্মাদনাবিহীনভাবে একটি “উত্তাপহীন বাজেট”। বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম হলেও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। এটি জিডিপির ১২ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।

এবারের বাজেট অনেকটাই সংকোচনমূলক। অতীতের মতো উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে ব্যয় সংকোচন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যদিও বাস্তবে তা ৯-১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে এনবিআরের অংশ ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। এটি অর্জনের জন্য অতিরিক্ত কর আহরণ, কর ছাড় কমানো এবং করের আওতা বাড়ানো হবে, ফলে সাধারণ জনগণের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ শতাংশ, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা (জিডিপির ৩.৬ শতাংশ)। এটি কম হওয়ায় বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়নের গুণগত মান নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না। গত অর্থবছরের সংশোধিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.২৫ শতাংশ, যদিও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ৩.৩-৩.৯ শতাংশ প্রাক্কলন করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ ধরা হয়েছে।

উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩১ শতাংশ। অপরদিকে পরিচালন ব্যয় ৪ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ ৬৯ শতাংশ। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এই খাতে ব্যয় বাড়ার প্রধান কারণ। যদিও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য কোনো প্রণোদনার কথা বলা হয়নি, যা সমাজে বৈষম্যের অনুভূতি বাড়াতে পারে।

কৃষিখাতে বরাদ্দ কমেছে। মোট বাজেটের মাত্র ৫.৮৬ শতাংশ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কৃষিসংশ্লিষ্ট পাঁচটি মন্ত্রণালয়কে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১০.৬৫ শতাংশ। কৃষি ভর্তুকিও হ্রাস পেয়েছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এবং খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ২৫.৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং খাদ্যগুদাম ধারণক্ষমতা বাড়ানোর অঙ্গীকার করা হয়েছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে সামান্য। শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের ১২ দশমিক ১ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হলেও, প্রয়োজনীয় রূপান্তরের তুলনায় তা অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সার্বিকভাবে প্রস্তাবিত বাজেটটি একদিকে সংকোচন ও আর্থিক শৃঙ্খলার দিকে এগোলেও, কৃষি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ না থাকায় এটি একটি ভারসাম্যহীন অথচ প্রয়োজনভিত্তিক বাজেট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বাস্তবায়নের দক্ষতা ও জনগণের ওপর আরোপিত চাপ কমানোর কৌশলই ঠিক করবে এই বাজেটের সফলতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন