১৯৭৭ সালে ঢাকায় জাপানিজ রেড আর্মির বিমান ছিনতাই

১৯৭৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর জাপানিজ রেড আর্মির (JRA) পাঁচ সদস্যের একটি দল টোকিও থেকে প্যারিসগামী জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৪৭২ ছিনতাই করে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা।

হাইজ্যাকারদের পরিচয়

জাপানিজ রেড আর্মি ছিল একটি সশস্ত্র কমিউনিস্ট গোষ্ঠী, যারা বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করত। এই ছিনতাইয়ের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেলে থাকা তাদের ৯ জন কমরেডকে মুক্ত করা এবং ৬ মিলিয়ন ডলার মুক্তিপণ আদায় করা।

ছিনতাইয়ের শুরু

বিমানটি প্রথমে জাপানের হানেদা বিমানবন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। হাইজ্যাক করার পর ছিনতাইকারীরা বিমানটিকে ভারতের বোম্বে বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য করে। সেখানে কিছু সময় থাকার পর তারা বিমানটি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

ঢাকায় অবতরণ

১লা অক্টোবর হাইজ্যাকাররা বিমানটি ঢাকার তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করায়। এ সময় বিমানবন্দরের চারপাশে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার দিকে।

জিম্মিদের পরিস্থিতি

বিমানটিতে ১৪২ জন যাত্রী এবং ১০ জন ক্রু সদস্য ছিলেন। হাইজ্যাকাররা তাদের জিম্মি করে রাখে এবং তাদের মুক্তির জন্য জাপানি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। পরিস্থিতি ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান সরকার এই সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সেসময় এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

মুক্তিপণের দাবি

ছিনতাইকারীরা দুটি প্রধান দাবি উত্থাপন করে: জাপানের কারাগারে বন্দি থাকা ৯ জন কমরেডকে মুক্তি দেওয়া এবং ৬ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার মুক্তিপণ হিসেবে প্রদান করা। জাপানি সরকার তাদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হয়।

বন্দিদের মুক্তি এবং মুক্তিপণ প্রদান

যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে জাপানি সরকার হাইজ্যাকারদের সব দাবি মেনে নেয়। মুক্তিপণ এবং বন্দিদের নিয়ে জাপানের একটি বিমান ঢাকায় আসে এবং তাদের হাইজ্যাকারদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা

সব দাবি পূরণ হওয়ার পর হাইজ্যাকাররা বিমান নিয়ে আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সেখানে তারা যাত্রীদের মুক্তি দেয় এবং রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সংকটের অবসান ঘটে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর প্রভাব

এই ঘটনা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একইসাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দক্ষতা এবং তৎকালীন সরকারের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাকেও তুলে ধরে। এটি জাপানিজ রেড আর্মির সর্বশেষ সফল অপারেশনগুলোর মধ্যে একটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন