ভারতের আসাম ও দার্জিলিং অঞ্চলের চা-বাগানগুলো সম্প্রতি অস্বাভাবিক খরা এবং তাপপ্রবাহের ফলে উৎপাদন হ্রাসের মুখে পড়েছে। চা উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলে তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের অস্থিরতা এখন আর বিরল ঘটনা নয়, বরং এটি শিল্পের নতুন বাস্তবতা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
ভারতীয় চা গবেষণা সংস্থার তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালে দেশের চা উৎপাদন প্রায় ৭.৮ শতাংশ কমে ১৩০ কোটি কেজিতে নেমে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদনের এই হ্রাসের প্রধান কারণ আসামের খরা ও উচ্চ তাপমাত্রা।
উৎপাদনের হ্রাসের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে দেখা দিয়েছে। ভারতের চায়ের গড় দাম ২০ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ২০১ রুপি ২৮ পয়সায় পৌঁছেছে। দেশে চায়ের চাহিদা গত এক দশকে ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দ্রুত বাড়তে থাকা অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে রফতানি হ্রাসের শঙ্কা তৈরি করছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ভারতের রফতানি ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক বাণিজ্যে ১২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে চা আমদানি বৃদ্ধি পেয়ে গত বছর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৪ কোটি ৫৩ লাখ কেজিতে পৌঁছেছে।
বিশেষ করে গুণমানের জন্য বেশি সমাদৃত আসামের ‘সেকেন্ড ফ্লাশ’ বা দ্বিতীয় দফার চা তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খরা শুধুমাত্র উৎপাদন কমাচ্ছে না, বরং পোকামাকড়ের আক্রমণও বাড়াচ্ছে যার ফলে পাতার মানও নষ্ট হচ্ছে। চা শিল্প ইতিমধ্যেই উচ্চ ব্যয়, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং পুরনো গাছ প্রতিস্থাপনের চাপে রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন সরকারি প্রণোদনা এই ক্ষতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারেও চা রফতানি সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর হওয়ায় ভারতের চা রফতানিতে বড় প্রভাব পড়তে পারে। গত বছর ভারত যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ কেজি চা রফতানি করেছিল, তবে চলতি বছরের জানুয়ারি-মে মাসে রফতানি ছিল মাত্র ৬২ লাখ ৬০ হাজার কেজি। ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন (আইটিএ) জানিয়েছে, ভারতের চা উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো অত্যন্ত সীমিত মুনাফা আয় করে তাই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে পারবে না এবং এর ফলে বৈশ্বিক চা সরবরাহ চেইনেও সংকট তৈরি হতে পারে।
এই পরিস্থিতি দেশের শতাব্দীপ্রাচীন চা শিল্পের ভবিষ্যৎকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে। খরা, তাপপ্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্ক বৃদ্ধি মিলিতভাবে ভারতের চা উৎপাদন ও রফতানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


