হিমালয়ের হিমবাহ গলে তৈরি হ্রদ ঝুঁকি বাড়া

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়ছে হিমালয়ে। এখানকার গ্লেসিয়ারগুলো দ্রুত হারে গলে যাচ্ছে এবং এর ফলে হিমবাহ হ্রদগুলোর আকার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই হ্রদগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ আরও বড় বিপদের সংকেত দিচ্ছে। কারণ এগুলো যে কোনো সময় ভয়াবহ হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। ভারতীয় আর্থ অবজারভেশন সংস্থা সুহোরা টেকনোলজিস বিশ্লেষণ করে দেখেছে যে, হিমালয়ের হিমবাহ হ্রদগুলোর সম্প্রসারণের হার ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে হিন্দু কুশ-কারাকোরাম-হিমালয় অঞ্চলে, যেগুলো মেরু অঞ্চলের বাইরে বিশ্বের বৃহত্তম বরফের মজুদ ধরে রেখেছে। গবেষণায় দেখা গেছে ১৯৯০ সালের পর থেকে এই অঞ্চলের হিমবাহ হ্রদগুলোর আয়তন ১০% এর বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে গঙ্গা অববাহিকায় হ্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ২২%।

সুহোরা টেকনোলজিসের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুসারে ইন্দুস, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ৩৩,০০০টিরও বেশি হ্রদ নজরদারির আওতায় রয়েছে এবং তারা নিশ্চিত করেছে যে গ্লেসিয়ার গলনের কারণে উচ্চ উচ্চতায় অবস্থিত হ্রদগুলো দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) জানিয়েছে, ১৯৮৪ সালের পর থেকে ২৭% হিমালয় গ্লেসিয়ার হ্রদের আয়তন বেড়েছে, যার মধ্যে ১৩০টি হ্রদ ভারতের অভ্যন্তরে রয়েছে। হিমালয় অঞ্চলের ৭৬% এর বেশি হিমবাহ হ্রদ প্রান্ত-মোরাইন দ্বারা বাঁধযুক্ত, আপাতদৃষ্টে অত্যন্ত দুর্বল গঠন। এই ধরনের হ্রদ সহজেই ফেটে যেতে পারে ও মারাত্মক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে। ২০২৩ সালে তুষারধ্বস ও অতিবৃষ্টির কারণে সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদের বিস্ফোরণ ছিল এমন একটি ঘটনা।

এই বিস্ফোরণের ফলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি প্রবাহিত হয়, ১৫টি সেতু ও একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ৯২ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, ১৮৩৩ সাল থেকে হিমালয় অঞ্চলে সংঘটিত GLOF ঘটনার ৭০% মাত্র গত ৫০ বছরের মধ্যে ঘটেছে। এর মধ্যে ৭২% ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ছিল তুষারধ্বস ও অতিবৃষ্টি। সুহোরা টেকনোলজিস হিমবাহ হ্রদ ও গ্লেসিয়ার পর্যবেক্ষণের জন্য সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (SAR) ও অপটিক্যাল ইমেজিং ব্যবহার করছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা হিমবাহ হ্রদের পরিবর্তন ও গ্লেসিয়ারের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করছে এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত করছে। উদাহরণস্বরূপ নেপাল-চীন সীমান্তের একটি গ্লেসিয়ার দ্রুত বিকৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে।

তবে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় এখনও অনেক ফাঁক রয়ে গেছে। ২০২৩ সালের সিকিম দুর্যোগ দেখিয়েছে, বাস্তবসম্মত সময়ে নজরদারি না থাকার কারণে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি অবকাঠামোগত ব্যবস্থা ছাপিয়ে যাওয়ার আগেই যথাযথ সতর্কতা জারি করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘ ‘বিশ্ব হিমবাহ দিবস’ ঘোষণা করেছে, যা এই বিপদের গুরুত্ব তুলে ধরে। এছাড়াও হিমালয়ের গ্লেসিয়ারগুলো ১.৯ বিলিয়ন মানুষের পানির প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখনই গ্লেসিয়ার সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। পাশাপাশি পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করতে হবে এবং কমিউনিটির সহনশীলতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ করতে হবে।তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।




LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন