আজ নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুরু হয়েছে এক উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক পরিবেশ সম্মেলন, যার মূল প্রতিপাদ্য—“জলবায়ু পরিবর্তন, পর্বতমালা ও মানবতার ভবিষ্যৎ”। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে হিমালয়ের গলতে থাকা তুষার ও বরফ, তার ফলে সৃষ্টি হওয়া বিপর্যয় এবং বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির সংকট নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গ প্রসাদ বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে এক গভীর বার্তা দেন: “পর্বত রক্ষা মানে পৃথিবী রক্ষা, পর্বত রক্ষা মানে সাগর রক্ষা, আর পর্বত রক্ষা মানেই মানবতা রক্ষা।” এই বক্তব্য শুধু একটি আবেগপ্রবণ আহ্বান নয়, বরং এটি বৈশ্বিক জলবায়ু নীতির বাস্তব অবস্থা ও পর্বতময় দেশগুলোর চরম ঝুঁকির প্রতিফলন।
নেপাল পৃথিবীর আটটি সর্বোচ্চ পর্বতের আবাসভূমি, যার মধ্যে এভারেস্ট সর্বোচ্চ। তবে এই গৌরব আজ এক অভিশাপে পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের গ্লেশিয়ার গলছে অভূতপূর্ব হারে, যার ফলে তুষারহীন হয়ে পড়ছে পর্বতচূড়া, উন্মুক্ত হচ্ছে দুর্বল পাথুরে স্তর এবং বাড়ছে ভূমিধস, পাথরঝরার ও হঠাৎ হিমপ্রপাতের ঝুঁকি।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, আগামী কয়েক দশক কিংবা শতাব্দীতে যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে হিমালয়ের গ্লেশিয়ারের ৮০% পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এটি শুধু পর্বতের জন্য নয় বরং উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য এক বিপর্যয়কর ভবিষ্যতের বার্তা বহন করছে। হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোই দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান পানিস্রোত, যা কৃষি, জীবনধারা এবং বাস্তুতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেবা সম্মেলনে বলেন, “বিষাদের বিষয় হলো, হিমালয় এখন এক নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। এটি শুধু আমাদের পর্বত বাস্তুতন্ত্রের ভঙ্গুরতা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রমের ব্যর্থতাও উদঘাটন করছে।”
তিনি আরও বলেন, “নেপালের মতো একটি পার্বত্য দেশ, যেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে আছে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন এক কঠিন বাস্তবতা।”
দেবা স্মরণ করিয়ে দেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নেপাল চরম আবহাওয়ার একের পর এক ধাক্কা খেয়েছে। হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ, আকস্মিক বন্যা, খরা, পানির ঘাটতি ও বনের আগুনে বিপর্যস্ত হয়েছে মানুষের জীবন ও জীবিকা। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে, আর নেপালের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই সম্মেলনে ভারতের, ভুটানের ও মালদ্বীপের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। অঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য এ সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। আয়োজকরা আশা করছেন, রবিবার আলোচনা শেষে “কাঠমান্ডু ঘোষণা” প্রকাশ করা হবে, যাতে বৈশ্বিক এবং স্থানীয় স্তরে জলবায়ু কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার অঙ্গীকার থাকবে।
এই সম্মেলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়,এটি এখনকার বাস্তবতা। হিমালয়ের পর্বত, যেগুলো হাজার বছর ধরে আমাদের কল্পনা, নদী ও জীবনধারার উৎস ছিল, আজ তারা নিজের অস্তিত্বের জন্য আর্তনাদ করছে। এখনই যদি আমরা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ না নিই, তবে পরবর্তী প্রজন্ম শুধু বরফহীন পর্বতই নয়, শুষ্ক নদী ও ভগ্ন পৃথিবী উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে।


