বর্তমানে কৃষকদের বড় ধরনের সংকটে ফেলে দিয়েছে কৃষিপণ্যের নিম্নমূল্য এবং হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়া। বিশেষ করে টমেটো, পেঁয়াজ এবং আলুর ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। কৃষক পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি টমেটো উৎপাদনে ব্যয় হয় ১২-১৩ টাকা, কিন্তু বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১৮ টাকায়। পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যয় ৩৮-৪০ টাকা হলেও কোনো কোনো স্থানে তা ৩৫ টাকায় নেমে এসেছে। অপরদিকে আলুর ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ দেখা দিয়েছে, যার ফলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না।
গত মৌসুমে আলুর ভালো দাম পাওয়ায় এবার আলুর আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি জমিতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন ১ কোটি ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে গেছে। হিমাগারের উচ্চ ভাড়ার কারণে অনেক কৃষক আলু সংরক্ষণ করতে না পেরে তাৎক্ষণিক বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে মৌসুম শেষে আলুর দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে। পেঁয়াজ ও টমেটোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। পেঁয়াজ চাষিরা বলছেন, গত বছর পেঁয়াজের উচ্চমূল্যের কারণে এবার চাষ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু আমদানির চাপ এবং স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে দাম কমে গেছে। টমেটোর ক্ষেত্রেও চাষিরা উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ) গত ৮ ফেব্রুয়ারি হিমাগারের ভাড়া বৃদ্ধি ঘোষণা করে, যেখানে প্রতি কেজি আলুর ভাড়া ৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কৃষকদের আন্দোলনের পর এটি কমিয়ে ৬.৭৫ টাকা করা হলেও কৃষকদের দাবি, এখনো এই হারও অনেক বেশি। বগুড়া, রংপুর ও জয়পুরহাটের হিমাগার মালিকরা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খরচ ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে ভাড়া বাড়াতে হয়েছে। তবে কৃষি বিপণন আইন ২০১৮ অনুযায়ী সরকারিভাবে গেজেট প্রকাশ না করে হিমাগার ভাড়া বাড়ানো আইনসঙ্গত নয়। কৃষকরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তারা আলুচাষে নিরুৎসাহিত হবেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেশি হিমাগার ভাড়ার কারণে কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষি খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে হিমাগার মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারি নীতিমালা কার্যকর করা দরকার। কৃষকদের দাবি হচ্ছে, প্রতি কেজি আলুর হিমাগার ভাড়া দেড় টাকার মধ্যে নামিয়ে আনা হোক। ধানের মতো আলুও সরকার ক্রয় করে সংরক্ষণ করুক। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হোক। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করা হোক।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়া জানিয়েছেন, সরকার ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে, যা কৃষকদের সংরক্ষণ সমস্যা লাঘব করবে। এছাড়া কৃষকদের বাড়িতে ছোট সংরক্ষণাগার তৈরি করতেও সহায়তা দেওয়া হবে। এদিকে সরকার আলু রফতানির বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলুর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে রফতানি সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু কৃষকদের দাবি, সরকারকেই হিমাগার ব্যবস্থাপনায় কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে যাতে কৃষকরা ন্যায্য দাম পান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায়।


