চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা নতুন কিছু নয়, তবে মানবদেহের চর্বি (ফ্যাট) থেকে স্টেম সেল আহরণের ধারণা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০০১ সালে UCLA গবেষকরা দেখান, এতদিন অবহেলিত ও অবাঞ্ছিত বলে বিবেচিত মানবদেহের চর্বিতে বিপুল পরিমাণে প্রাপ্তবয়স্ক স্টেম সেল (Adult Stem Cell) রয়েছে। এই আবিষ্কার হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
UCLA ল্যাবের গবেষকরা লিপোসাকশন প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত চর্বি থেকে প্রথমে পরিণত ফ্যাট সেল (adipocyte) আলাদা করেন। এরপর বাকি অংশ, ‘processed lipoaspirate’ (PLA) বিশ্লেষণ করেন। PLA-তে থাকে অপরিণত ফ্যাট সেল, এন্ডোথেলিয়াল সেল (রক্তনালির কোষ), স্কার-ফরমিং সেল ইত্যাদি। গবেষকরা অনুমান করেন PLA-তে থাকা অপরিণত ফ্যাট সেলগুলো হয়তো স্টেম সেল হিসেবে কাজ করতে পারে।
তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, PLA সেলগুলোকে বিশেষ গ্রোথ ফ্যাক্টর দিয়ে হাড় ও কার্টিলেজ কোষে রূপান্তর করা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ PLA সেলগুলো ল্যাবরেটরিতে দ্রুত সংখ্যায় বাড়ানো যায়—একটি লিপোসাকশন স্যাম্পল থেকে কোটি কোটি কোষ উৎপাদন সম্ভব। এই আবিষ্কার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।
গবেষকরা প্রথমে চেষ্টা করেন PLA সেল থেকে হৃদপিণ্ডের পেশীকোষ (কার্ডিওমায়োসাইট) ও রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াল সেল তৈরি করতে। কিছু পরীক্ষায় PLA সেল হৃদপিণ্ডের কোষের পাশে রেখে দেখা যায় তারা ছন্দবদ্ধভাবে স্পন্দিত হতে শুরু করে।
তবে PLA সেল সরাসরি হৃদপিণ্ডের কোষে রূপান্তরিত না হলেও, তারা আশপাশের কোষের পুনর্জন্ম ও রক্তনালির বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। গবেষণায় দেখা যায় PLA সেল (পরবর্তীতে যাদের Adipose Stromal Cell বা ASC নাম দেয়া হয়) অক্সিজেনের ঘাটতি টের পেলে প্রচুর গ্রোথ ফ্যাক্টর নিঃসরণ করে, যা নতুন রক্তনালি গঠনে সহায়ক। প্রাণীতে পরীক্ষায় দেখা যায় ASC ইনজেকশন দেয়ার পর আক্রান্ত পায়ে দ্রুত নতুন রক্তনালি গঠিত হয় এবং রক্তপ্রবাহ পুনরুদ্ধার হয়।
বর্তমানে হৃদরোগী ও রক্তনালির রোগীদের ওপর ASC ব্যবহার করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। আশা করা হচ্ছে ASC হয়তো নতুন রক্তনালি গঠন বা হার্ট ফাংশন উন্নত করতে পারবে। তবে এই চিকিৎসা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ ASC কোষ শরীরে বেশিদিন টিকে থাকে না; প্রায়ই এক সপ্তাহের মধ্যেই মারা যায়। ফলে বারবার ইনজেকশন দিতে হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ। তাছাড়া ASC কোষ হৃদপিণ্ডে ইনজেক্ট করার পর যদি সঠিক পরিবেশ না পায়, তাহলে তারা মারা যেতে পারে এবং তাতে বিপজ্জনক প্রদাহ হতে পারে।
বাজারে কিছু অসাধু ক্লিনিক কোনো বৈজ্ঞানিক প্রোটোকল ছাড়াই লিপোসাকশন স্টেম সেল দিয়ে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার দাবি করছে। তারা রোগীদের ভুল তথ্য দিয়ে আকৃষ্ট করছে, অথচ বাস্তবে PLA-তে নানা ধরনের কোষ থাকে এবং সেগুলো সঠিকভাবে আলাদা না করলে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। FDA কিছু ক্ষেত্রে নিজের কোষ ব্যবহারে ছাড় দিলেও, অপর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও যাচাই ছাড়া এই ধরনের চিকিৎসা ঝুঁকিপূর্ণ।
চর্বি-উৎপন্ন স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। ভবিষ্যতে এই কোষগুলোকে আরও কার্যকরভাবে নির্দিষ্ট অঙ্গ বা টিস্যুতে পৌঁছানো, তাদের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর জন্য আরও গবেষণা দরকার। ASC কোষের মাধ্যমে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরিতে রক্তনালির জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজেও এই কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবদেহের চর্বি থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেল হৃদরোগসহ নানা জটিল রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তবে এই সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে আরও গভীর ও নিয়ন্ত্রিত গবেষণা অপরিহার্য। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় মানবদেহের অজানা সম্ভাবনা আবিষ্কারের এই যাত্রা চলতেই থাকবে—তবে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, বাস্তবতা ও নৈতিকতা সবকিছু মাথায় রেখে এগোতে হবে। চর্বি-উৎপন্ন স্টেম সেল একদিন হয়তো হৃদরোগ চিকিৎসায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে, তবে এখনই অতি-আশাবাদী হওয়া বা অন্ধভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করা বিপজ্জনক।


