লন্ডনের হোলোয়ে কলেজের অর্থনীতিবিদ এবং সহিংস সংঘাতে মৃত্যুহার সংক্রান্ত বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ মাইকেল স্প্যাগাট একাধিক গবেষণা করেছেন ইরাক, সিরিয়া ও কসোভোর যুদ্ধ নিয়ে। গত সপ্তাহে তিনি ও তার গবেষক দল গাজা উপত্যকায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত একটি গবেষণা প্রকাশ করেছেন।
এতে তিনি ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ ও গবেষক ড. খলিল শিকাকির সহায়তায় গাজার ২ হাজার পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এর আওতায় প্রায় ১০ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গাজায় মোট ৭৫ হাজার ২০০ জন মানুষ সহিংসতায় নিহত হয়েছে। এদের প্রায় সবাই ইসরায়েলি গোলাবারুদের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে।
তখন গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছিল, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪৫ হাজার ৬৬০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। অর্থাৎ, মন্ত্রণালয়ের হিসাব প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ৪০% কম দেখানো হয়েছিল।
গবেষণাটি এখনও ‘পিয়ার রিভিউ’-এর মাধ্যমে পর্যালোচিত হয়নি, অর্থাৎ এটি ‘প্রিপ্রিন্ট’ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। তবে এর ফলাফল ‘লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’-এর গবেষকদের এক ভিন্নধর্মী পদ্ধতিতে করা গবেষণার সঙ্গে অনেকটাই মিলেছে। ওই গবেষণাও দেখিয়েছিল, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত মৃত্যুর পার্থক্য প্রায় ৪০%।
স্প্যাগাট ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে—“এক্সেস মোর্টালিটি” বা অতিরিক্ত মৃত্যুর হার। অর্থাৎ যুদ্ধের সরাসরি আক্রমণ ছাড়াও ক্ষুধা, ঠান্ডা, চিকিৎসার অভাব ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধ্বংসের ফলে কতজন মানুষ মারা গেছে।
নতুন জরিপ অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যু হয়েছে ৮ হাজার ৫৪০ জনের। এই সংখ্যা যেকোনো মানদণ্ডে অনেক বেশি। তবে আগের অনুমিত লাখো মৃত্যুর তুলনায় তা কম।
অর্থাৎ, সহিংসতা ও ক্ষুধা-রোগে মৃত্যুর সংখ্যা মিলিয়ে জানুয়ারির আগেই ৮৩ হাজার ৭৪০ জন নিহত হয়েছে। তবে অধ্যাপক মাইকেল স্প্যাগাট জোর দিয়ে বলেছেন, জানুয়ারির তুলনায় এখন হয়তো সহিংসতার বাইরের মৃত্যুর হার আরও বেড়েছে।
এর একটি বড় কারণ হলো—গাজার মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের স্থানচ্যুতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সম্পূর্ণ ধ্বংস। পাশাপাশি মার্চে যুদ্ধবিরতি ভেঙ্গে যাবার পর থেকে ইসরাইলি অবরোধে খাদ্যের ঘাটতি ও জাতিসংঘের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে অধ্যাপক স্প্যাগাট বলেন, গাজার যুদ্ধ ২১ শতকের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতগুলোর একটি। সিরিয়া, ইউক্রেন ও সুদানের মতো দেশগুলোর মোট মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো বেশি, কিন্তু গাজা এগিয়ে আছে যোদ্ধা ও বেসামরিক নিহতের অনুপাত এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে মৃত্যুর হারের দিক থেকে।
জরিপের সঙ্গে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মিলে যায়। জরিপ অনুযায়ী, নিহতদের ৫৬%ই শিশু (১৮ বছরের নিচে) অথবা নারী।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে এই হার প্রায় নজিরবিহীন।
স্প্যাগাটের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় সহিংস মৃত্যুর শিকার হওয়া নারী ও শিশুর অনুপাত অন্য সব সাম্প্রতিক সংঘাতের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। যেমন কসোভোতে এ অনুপাত ছিল ২০%, ইথিওপিয়ার উত্তরে ৯%, সিরিয়ায় ২০%, কলম্বিয়ায় ২১%, ইরাকে ১৭% ও সুদানে ২৩%।
গবেষণায় আরেকটি চরম তথ্য পাওয়া গেছে—জনসংখ্যার অনুপাতে নিহতের সংখ্যা। স্প্যাগাট বলেন, “আমার ধারণা, গাজার প্রায় ৪% জনগণ নিহত হয়েছেন। ২১ শতকে আর কোনও সংঘাতে এত উচ্চ হার দেখা গেছে বলে আমার জানা নেই।”
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে যেভাবে বিশদ ও নির্ভরযোগ্য তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার বিপরীতে ইসরায়েলের সরকারি মুখপাত্রদের নীরবতা বিস্ময়কর। ৭ অক্টোবরের যুদ্ধই প্রথম, যেখানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী শত্রুপক্ষের নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যা জানায়নি।
ইসরায়েলি মুখপাত্র ও আইডিএফ শুধু একটি সংখ্যা বারবার উল্লেখ করছে— ২০ হাজার হামাস ও অন্যান্য সংগঠনের যোদ্ধা নিহত হয়েছে। কিন্তু এই দাবির পেছনে নেই কোনও নামের তালিকা, কিংবা কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
স্প্যাগাটের মতে, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ এই ২০ হাজার যোদ্ধার নাম প্রকাশের চেষ্টা করলেও মাত্র কয়েকশ নাম পাওয়া গেছে। এমনকি হাজার জনের তালিকা তৈরি করাও কঠিন।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের ইতিহাসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ম্যাথিউ গ্যাব্রিয়েল ককারিল ম্যাথিউ ককারিলও এই সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন না। তিনি বলেন, “ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, সাধারণত যত যোদ্ধা নিহত হয়, তার অন্তত দ্বিগুণ আহত হয়।সুতরাং যদি ইসরায়েল বলে ২০ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে, তবে অন্তত ৪০ হাজার আহত হয়েছে। এ হিসেবে হামাসের মোট যোদ্ধা সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ হাজার। আর এটি বাস্তবসম্মত নয়।”
তবে ধরা যাক, ইসরায়েলের দেওয়া সংখ্যাই সঠিক। তবু হিসাব বলছে, ১ জন হামাস যোদ্ধার বিপরীতে ৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। অথচ ইসরায়েলি মুখপাত্ররা দাবি করেন, এই অনুপাত ১:১।
ভয়ংকর এই সংখ্যাগুলোর পরও অধ্যাপক স্প্যাগাট বলছেন–“এই জরিপের তথ্য দিয়ে ‘গণহত্যা’ শব্দের সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।ইসরায়েলের পক্ষ থেকে গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণ করা এখনও বাকি।” তার মতে, গাজায় যা ঘটছে, সেটি সম্ভবত “শুধু জাতিগত নির্মূল”।


