হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসের ইতিহাস

মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মের গুরুত্ব অপরিসীম। যুগে যুগে বিভিন্ন ধর্ম উদ্ভব হয়েছে, বিকাশ লাভ করেছে এবং কখনো কখনো বিলুপ্তও হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে প্রচলিত প্রধান ধর্মগুলো যেমন ইসলাম, খ্রিস্টান ধর্ম, হিন্দু ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম টিকে থাকলেও ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে বহু ধর্ম হারিয়ে গেছে বা বিলুপ্তির পথে রয়েছে। বিলুপ্ত প্রায় ধর্ম বলতে সেই ধর্মগুলোকে বোঝানো হয়, যেগুলোর অনুসারী সংখ্যা খুবই কমে গেছে অথবা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কোনো ধর্ম হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানা কারণ কাজ করে। কিছু ধর্ম অন্য ধর্মের সাথে মিশে গেছে, আবার কিছু ধর্ম রাজনৈতিক কারণে দমন করা হয়েছে।

মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক, ইরান, সিরিয়া, তুরস্কের কিছু অংশ) ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সভ্যতার কেন্দ্র। এখানকার মানুষ বিভিন্ন দেব-দেবীর উপাসনা করত। এনকিল, এনকি, ইনান্না, মারডুক, ও আনু তাদের প্রধান দেবতা ছিলেন। তবে খ্রিস্টান ও ইসলামের বিস্তারের ফলে এই ধর্ম ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। প্রাচীন মিশরের ধর্মীয় বিশ্বাসে ফারাওরা দেবতার সন্তান হিসেবে বিবেচিত হতেন। রা (সূর্যদেব), ওসিরিস, আইসিস, অনুবিস প্রভৃতি দেবতার পূজা করা হতো। খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের বিস্তারের ফলে ধীরে ধীরে মিশরীয় ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে দেব-দেবীর পূজা প্রচলিত ছিল। জিউস, পোসেইডন, এথেনা, হার্মিস প্রভৃতি গ্রিক দেবতাদের উপাসনা করা হতো। পরবর্তীতে খ্রিস্টধর্মের প্রসারে এই ধর্ম বিলুপ্ত হয়।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার ভাইকিংরা ওডিন, থর, লোকি প্রভৃতি দেবতাকে পূজা করত। মধ্যযুগে খ্রিস্টধর্মের ব্যাপক প্রচারের ফলে ভাইকিং ধর্ম বিলীন হয়ে যায়। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার আজটেক ও মায়া সভ্যতার মানুষ সূর্যদেবসহ অন্যান্য দেবতার পূজা করত। স্প্যানিশ উপনিবেশ স্থাপনের পর এই ধর্ম প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে যায়। মিত্রায়িজম ছিল রোমান সাম্রাজ্যের একটি জনপ্রিয় ধর্ম, যেখানে সূর্যদেব মিত্রার পূজা করা হতো। খ্রিস্টধর্মের উত্থানের ফলে এই ধর্ম হারিয়ে যায়। পারস্যের মণি নামক ধর্মগুরু এক নতুন ধর্ম প্রচার করেছিলেন, যা মূলত জরাথুস্ট্রবাদ, বৌদ্ধধর্ম এবং খ্রিস্টধর্মের সংমিশ্রণে গঠিত ছিল। ইসলাম ধর্মের বিস্তারের ফলে এটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ধর্ম বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে অনেক কারণ থাকে।

ধর্মান্তরকরণে নতুন ধর্মের প্রচারের ফলে পুরনো ধর্মের অনুসারীরা নতুন ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক কারণে কোনো ধর্মের অনুসারীদের দমন করা হলে সেই ধর্ম বিলুপ্ত হতে পারে। এক দেশ বা সভ্যতা যখন অন্য দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়। অনেক সময় একটি ধর্ম অন্য ধর্মের সাথে মিশে গিয়ে নতুন একটি ধর্মের জন্ম দেয়, ফলে আগের ধর্মটি হারিয়ে যায়। ধর্মের বিলুপ্তি শুধু আধ্যাত্মিক দিক থেকেই নয়, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলে। মেসোপটেমিয়া ও মিশরের প্রাচীন ধর্মের বিলুপ্তি স্থাপত্য, সাহিত্য ও জীবনধারায় পরিবর্তন এনেছে। ইতিহাসে বহু ধর্ম বিলুপ্ত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হতে পারে। বিলুপ্ত প্রায় ধর্মগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ, যা আমাদের অতীত সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে।



LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন