মানুষ প্রায় ২৪ লাখ বছর ধরে বিদ্যমান। কিন্তু আমাদের নিজস্ব প্রজাতি হোমো সেপিয়েন্স—যাকে লেখক আমাদের “চরমভাবে ব্যতিক্রমী মহান বানর” বলে অভিহিত করেছেন সে সময়ের মাত্র ৬ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১,৫০,০০০ বছর ধরে আছে। তাই যে বইয়ের নাম Sapiens, সেটিকে উপশিরোনামে “মানবজাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” বলা কিছুটা বিভ্রান্তিকর। লেখক ইউভাল নোয়া হারারি কেন বইয়ের ৯৫% অংশ আমাদের প্রজাতির ওপর দিয়েছেন, তা সহজেই বোঝা যায়: আমরা যতই আত্ম-অজ্ঞ হই না কেন, নিজেদের সম্পর্কে অন্য কোনো বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির চেয়ে অনেক বেশি জানি। তবুও সেপিয়েন্স-এর ইতিহাস আসলে মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র অংশ।
প্রশ্ন হলো এই বিশাল ইতিহাস কি মাত্র ৪০০ পৃষ্ঠায় ধরা সম্ভব? পুরোপুরি নয়। বরং ১৪ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত রূপ লেখা হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজ। হারারি কেবল অতীতে সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়েও অনেক আলোচনা করেছেন। তবে সেপিয়েন্স-এর মূল কাহিনির ধারা মোটামুটি সবাই মেনে নেবে, আর তিনি তা জীবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন।
আমাদের অস্তিত্বের প্রথম ভাগটা কেটেছে বেশ সাধারণভাবে; এরপর এসেছে ধারাবাহিক কয়েকটি বিপ্লব। প্রথমত, “জ্ঞানবিপ্লব”: প্রায় ৭০,০০০ বছর আগে আমরা হঠাৎ আগের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী আচরণ শুরু করি কেন হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয় এবং দ্রুত সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ি। প্রায় ১১,০০০ বছর আগে শুরু হয় কৃষিবিপ্লব, যখন আমরা শিকার-সংগ্রহ থেকে চাষাবাদে রূপান্তরিত হই। প্রায় ৫০০ বছর আগে শুরু হয় বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, যা ২৫০ বছর আগে শিল্পবিপ্লবের জন্ম দেয়। এরপর আসে তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লব (প্রায় ৫০ বছর আগে), আর বর্তমানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি জীবপ্রযুক্তি বিপ্লবের শুরুতে, যা এখনো নবজাতকের মতো। হারারি মনে করেন, এই জীবপ্রযুক্তি বিপ্লবই হয়তো সেপিয়েন্স-এর সমাপ্তি ঘটাবে, আমাদের জায়গা নেবে বায়োইঞ্জিনিয়ার্ড “পোস্ট-হিউম্যান” অমর সাইবর্গরা।
এই কাঠামোর পাশাপাশি হারারি উল্লেখ করেছেন আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেমন ভাষার বিকাশ: যার ফলে আমরা বিমূর্তভাবে চিন্তা করতে শিখেছি, বৃহৎ সংখ্যায় সহযোগিতা করতে পেরেছি, আর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আড্ডা দিতে শিখেছি। তারপর এসেছে ধর্মের উত্থান, যেখানে বহুদেববাদকে ধীরে ধীরে একেশ্বরবাদ প্রতিস্থাপন করেছে। এসেছে অর্থ ও বিশেষত ঋণের বিকাশ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্য ও বাণিজ্যের বিস্তার এবং পুঁজিবাদের উত্থান।
হারারি এসব বিশাল ও জটিল বিষয়কে ঝাঁকুনি দিয়ে, অনেক সময় চমকপ্রদ ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন। তার একটি মজার মন্তব্য “আমরা গমকে গৃহপালিত করিনি, গমই আমাদের গৃহপালিত করেছে।” মানুষের সাথে শস্যের এই চুক্তিকে তিনি “ফাউস্টীয় চুক্তি” বলেছেন যেখানে মানুষ প্রকৃতির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিঁড়ে লোভ ও বিচ্ছিন্নতার দিকে দৌড়েছে। ফল? তার মতে, কৃষিবিপ্লব ছিল “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা”—যা আমাদের দিয়েছে খারাপ খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনাহারের ঝুঁকি, ভিড়ের মধ্যে বসবাস, রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়া, নিরাপত্তাহীনতা এবং কঠোর সামাজিক স্তরবিন্যাস।হারারি এমনকি মনে করেন, পাথর যুগে আমরা হয়তো বেশি ভালো ছিলাম। তিনি আধুনিক শিল্পকারখানাভিত্তিক প্রাণী-পালনকে “ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
তার মতে, আমাদের আবেগ ও ইচ্ছার মৌলিক কাঠামো এসব বিপ্লবের পরও বদলায়নি—“আমাদের খাদ্যাভ্যাস, সংঘাত, যৌনতা সবই সেই শিকারি-সংগ্রাহক মস্তিষ্কের ফল, যা আজকের মহাশহর, বিমান, ফোন ও কম্পিউটারের সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।” উদাহরণস্বরূপ, আমাদের চিনি ও চর্বির প্রতি প্রবল আকর্ষণই আমাদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করেছে। একইভাবে পর্নোগ্রাফি ভোগও একধরনের অতিভোজনের মতো, যদি মস্তিষ্ককে শরীরের মতো দেখা যেত তাহলে আসক্তদের মস্তিষ্ক দেখতে মোটা মানুষের শরীরের মতো হতো।
হারারি বলেন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম লক্ষ্য “গিলগামেশ প্রকল্প” মানুষকে অমর বা “ইমমর্টাল” করা। তবে ইমমর্টাল মানে অমর নয়, কারণ সহিংসতায় মৃত্যু সম্ভবই থাকবে। তার আশঙ্কা, এই অবস্থায় আমরা হয়তো অতিরিক্ত ভীরু হয়ে যাবো, প্রিয়জনের মৃত্যু আরও অসহনীয় হবে, আর সবকিছুতেই একসময় বিরক্তি এসে যাবে। যেমন টলকিনের এলফরা ভাবত যে মৃত্যুই মানুষের জন্য এক বিশেষ উপহার। কবি ফিলিপ লারকিনের ভাষায়, “সব কিছুর নীচে বিস্মৃতির আকাঙ্ক্ষা লুকিয়ে থাকে।”
এমনকি এই সব সমস্যা বাদ দিলেও, ইমমর্টাল হওয়া সুখের নিশ্চয়তা দেয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন সুখের মাত্রা আমাদের বস্তুগত অবস্থার সাথে খুব বেশি সম্পর্কিত নয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেলে টাকা সুখ দেয়, কিন্তু এর পর আর তেমন পার্থক্য করে না। লটারি জেতার আনন্দও গড়ে দেড় বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
হারারি বারবার বলেন, হয়তো আজকের সেপিয়েন্স-এর জীবন ১৫,০০০ বছর আগের মানুষের জীবনের চেয়ে খারাপ। তার বই অনেক জায়গায় আকর্ষণীয় ও সুন্দরভাবে লেখা হলেও, ক্রমে অসতর্কতা, অতিরঞ্জন ও চমকপ্রদ শিরোনামের জন্য মান কমে যায়। যেমন, নাভারিনো যুদ্ধের তার বিবরণ বিকৃত ও অসম্পূর্ণ উইকিপিডিয়া পড়লেই তা বোঝা যাবে।
আধুনিক উদার সংস্কৃতির সমালোচনায়ও তিনি প্রায়শই অতিরঞ্জিত বা ভ্রান্ত মন্তব্য করেন যেমন “সব মানবতাবাদী মানুষকে পূজা করে” বা “লিবারেল হিউম্যানিজম একধরনের ধর্ম”—যা বাস্তবতার সাথে খাপ খায় না।


