পল সেলানের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও বারবার উদ্ধৃত কবিতা নিঃসন্দেহে Death Fugue (Todesfuge)। সাহিত্য বিশ্লেষক সিদ্রা ডিকোভেন এজরাহি বলেছেন, এটি হোলোকাস্টের এমন এক প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেমন হয়ে উঠেছে ওয়ারশ গেটোয় ছোট্ট ছেলেটির সেই বিখ্যাত ছবিটি, যে আতঙ্কে হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে।
এই কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেখা হয় এবং ১৯৪৭ সালের মে মাসে রোমানিয়ার একটি ম্যাগাজিনে প্রথম ছাপা হয়, যেখানে এর নাম ছিল Tango of Death। এটি ছিল সেলানের প্রথম প্রকাশিত কবিতা এবং তিনির নতুন ছদ্মনাম “সেলান” ব্যবহার করার প্রথম উদাহরণও।
শোনা যায়, দার্শনিক থেওডর অ্যাডোর্নো যখন Death Fugue পড়েন এবং এতে থাকা অতিবাস্তব কল্পনা ও চরম সৌন্দর্যের মিশ্রণ দেখেন, তখনই তিনি তাঁর বিখ্যাত মন্তব্যটি করেন “আউশভিৎসের পর কবিতা লেখা বর্বরতা”। যদিও তিনি পরে এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন এবং এমনকি সেলানের একটি কবিতার বই অনুবাদ করতেও আগ্রহী ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তাঁর বই Negative Dialectics-এ অ্যাডোর্নো তাঁর সেই প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি সংশোধন করেন।
প্রথমদিকে অনেকে এই কবিতাকে অতি-রোমান্টিক ও নান্দনিক বলে সমালোচনা করেন। বলা হয়, এটি হোলোকাস্টের ভয়াবহতাকে হালকা করে তোলে। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে জার্মানিতে যখন এই কবিতা ব্যাপক স্বীকৃতি পেতে থাকে, সেলান অনুভব করেন, জার্মান জাতি এই কবিতাকে তাদের অপরাধবোধ ঢাকতে ব্যবহার করছে। তাই তিনি এরপর আর কবিতাটি জনসমক্ষে পাঠ করতেন না এবং কোনো সংকলনে রাখতেও নিষেধ করেন।
যদিও কবিতাটি রূপক ও প্রতীকে পরিপূর্ণ, এতে যে সব ছবি আঁকা হয়েছে, সেগুলো বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে গড়া এবং হোলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকের বিবরণ থেকে নেওয়া। কবিতাটি যখন প্রথম ছাপা হয়, তখন তার পরিচিতিতেই বলা হয়েছিল এই ভাষা বাস্তবতার ভেতরেই প্রোথিত। সাহিত্য বিশ্লেষক জন ফেলস্টিনার Death Fugue-কে “পরবর্তী ইউরোপীয় সাহিত্যের গুয়ার্নিকা” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
কবিতার শুরুতেই বন্দীদের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসে এক যন্ত্রণাকাতর উচ্চারণ:
“Black milk of daybreak we drink it at evening
we drink it at midday and morning we drink it at night
we drink it and we drink
we shovel a grave in the air.”
এই মন্ত্রমুগ্ধ করা পংক্তিগুলো প্রতিটি স্তবকে ফিরে আসে। এরপর ভয়াবহ বর্ণনা—বন্দিদের জীবন ও শিবিরের কমান্ডারের নির্মমতা। একই শব্দ, বিনা যতিচিহ্নে, ঘুরে ফিরে আসে, এক অদ্ভুত চক্রে, যেন ব্যক্তিসত্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, শুধু থেকে যায় চলন্ত মৃতদেহ। একটি পর্যায়ে “আমরা তা খাই” বদলে হয়ে যায় “আমরা তোকে খাই” নিরবিচার হতাশার ভেতর এক অদ্ভুত উল্টো উচ্চারণ।
কবিতায় কোনো নির্দিষ্ট কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের নাম নেই, কিন্তু এর প্রতিটি চিত্র যেন হোলোকাস্টে জীবিত বেঁচে ফেরা মানুষদের বয়ানের অনুরূপ।কবিতার “আমরা”এই প্রথম পুরুষ বহুবচন আমাদের নিয়ে যায় কাঁটাতারের ভেতরে। ব্যক্তিগত “আমি”-এর পরিবর্তে “আমরা” ব্যবহারে, সেলান যেন ইহুদি নির্যাতিতদের বাইরেও সমগ্র মানবজাতিকে এই সহিংসতার ভেতরে যুক্ত করে দেন।
এছাড়াও কবিতার “জার্মান প্রভু” যিনি তাঁর স্বর্ণকেশী প্রিয়তমা মার্গারেটকে চিঠি লিখছেন, আবার একইসাথে ইহুদিদের গ্যাসচেম্বারে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন—এটি একটি দোদুল্যমান সংকেত, যার মধ্যে বহুস্তর রয়েছে। “মাস্টার” বা “প্রভু” শব্দটি এখানে শুধু ব্যক্তি নয়, বরং নাৎসি নির্মূলযন্ত্রের কারিগর, ক্যাম্পের অধিপতি, এমনকি আর্য শ্রেষ্ঠ জাতির প্রতিনিধিকেও নির্দেশ করে।
কবিতার ট্যাঙ্গো থিমটি দুটি দিক থেকে অর্থবহ। একদিকে এটি ইউরোপের জনপ্রিয় নৃত্য, সেলানের যৌবনের স্মৃতি, আবার অপরদিকে এটি ক্যাম্পের সেই ভয়াবহ চিত্র, যেখানে ইহুদি সঙ্গীতজ্ঞদের দিয়ে বন্দিদের মৃত্যুর পথে এগিয়ে যেতে ট্যাঙ্গো বাজানো হতো। চেরনিভসি, লেমবার্গ (বর্তমানে লভিভ, ইউক্রেন), ও আউশভিৎসে এমন ঘটনা ঘটে। অবশেষে সেই অর্কেস্ট্রার সদস্যদেরই হত্যা করা হতো।
এই ট্যাঙ্গো জার্মান সংস্কৃতিতে ইহুদি উপস্থিতির অতীত স্মৃতিও বহন করে। কবিতার ছন্দ, শব্দের বুনন, এমনভাবে সাজানো যেন তা একটি সঙ্গীত রচনার মতো একটি ফিউগ, যার কাঠামো জটিল, ঘুরপাক খাওয়া, নিয়মতান্ত্রিক। তবে এই ‘ফিউগ’ শব্দটি মানসিক ব্যাধি পরিচয় ভুলে যাওয়ার এক মানসিক অবস্থা সেই অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।
সেলানের অন্য কবিতাতেও “খনন” (digging) থিমটি আসে, যেমন “There Was Earth in Them”—যেখানে বন্দিরা চব্বিশ ঘণ্টা খনন করছে। সেখানে কোনো ঈশ্বর নেই, ভাষা নেই, বুদ্ধি নেই। Death Fugue-এ “আকাশে কবর” তৈরি মানে, বাস্তবে মৃতদের দাহ করা হতো, আর তাদের ছাই উঠে যেত আকাশে। ভয়ঙ্কর সব প্রতীকের সমাবেশ সাপ, কুকুর, কবর, কোদাল, নীল চোখের কমান্ডার, হুকুমের কণ্ঠ—সব একত্র হয়ে গড়ে তোলে মৃত্যু যন্ত্রের চিত্র।
অনেক পাঠক মনে করেন, মার্গারেট ও শুলামিথের মিলন যেন কোনো মিলনের আশ্বাস। কিন্তু সেলানের কাছে এটা কোনো ক্ষমা নয়, বরং একটি ভয়াবহ বাস্তবতারই প্রকাশ যা শুলামিথকে মেরে ফেলে। এই দুই নারী কখনোই মিলিত হয় না যেমন জার্মান ও ইহুদি ইতিহাসের বিচ্ছেদ কখনো পূরণ হয়নি।
শেষ লাইনে সেলান শুলামিথকে তুলে ধরেন, যেন এই ‘Jewish Beloved’ হয়ে ওঠে কবিতার চূড়ান্ত কণ্ঠস্বর—একটি প্রত্যাখ্যান, যে প্রত্যাখ্যান নাৎসি পরিকল্পিত পরিচয় মুছে ফেলার বিরুদ্ধে।


