বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের এই সময়ে জনস্বাস্থ্য খাতের সংস্কারকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের স্বাস্থ্যনীতি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। ঢাকার সিরডাপ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এক নীতি সংলাপে এই আহ্বান জানানো হয়। সংলাপটি আয়োজন করে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি), ইউএইচসি ফোরাম ও ইউনিসেফ।
সংলাপের সূচনা বক্তব্যে পিপিআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন (এইচএসআরসি) একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করলেও বাস্তবায়নের দিক থেকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অনুপস্থিত। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘অতীতের মতো এবারও যেন গুরুত্বপূর্ণ নীতিপরামর্শ হারিয়ে না যায়। যে গতি তৈরি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে হবে এবং বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকারের দ্রুত চিহ্নিতকরণ ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন।’’
আলোচনায় অংশ নেন স্বাস্থ্য, নীতি গবেষণা, প্রাক্তন সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ বহু বিশিষ্টজন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ড. আমিনুল হাসান, ড. ফিদা মেহরান, অধ্যাপক এম.এ. ফয়েজ, ড. সৈয়দ লিয়াকত আলী, ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ, সাংবাদিক শিশির মোরল, ড. আবুল কালাম আজাদ, ড. মোশতাক হোসেন, ড. ইমরান আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।
তারা বলেন এইচএসআরসি প্রতিবেদন একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হলেও গত তিন মাসে সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো বাস্তবধর্মী অগ্রগতি চোখে পড়েনি। বক্তারা অভিযোগ করেন বর্তমানে যেসব কার্যক্রম চলছে,তা মূলত টেকসই উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হলেও কাঠামোগত সংস্কার এখনো উপেক্ষিত।
সংলাপে বক্তারা স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে একটি সময়সীমাবদ্ধ ও ক্ষমতাসম্পন্ন স্বাস্থ্য সংস্কার টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। এই টাস্কফোর্স আইনি, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সংস্কারের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। এতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে।
আলোচনায় বেশ কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও তুলে ধরা হয়, যেমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দ্বৈত দায়িত্ব, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি, স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলের অভাব এবং সরকারি বাজেট বরাদ্দের ঘাটতি। বক্তারা বলেন, প্রজনন স্বাস্থ্য, চিকিৎসা সেবাদানকারীর নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য-সচেতনতা বাড়ানো সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ দিক।
তারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বাস্তব সংস্কার কেবল কারিগরি সক্ষমতা দিয়ে সম্ভব নয় এটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বাজেট বরাদ্দের প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করে। বাজেট ও রাজনৈতিক মালিকানার অভাবে ভালো পরিকল্পনাগুলোও ব্যর্থ হয়ে পড়ে।
অংশগ্রহণকারীরা একটি নাগরিক সমাজভিত্তিক সংস্কার প্ল্যাটফর্ম গঠনের ওপর জোর দেন, যার মাধ্যমে পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে।
সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান “জুলাই চার্টার”-এর কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি যেন জাতীয় রূপান্তরের একটি কাঠামো হিসেবে স্বাস্থ্যখাত সংস্কারকে অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি বলেন, এখন দরকার দুটি সমান্তরাল ধারা—একদিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সমর্থন ও জনসচেতনতা তৈরির জন্য জোরালো প্রচারণা।
সবশেষে সংলাপ থেকে দৃঢ় বার্তা উঠে আসে পর্যালোচনার সময়সীমা দ্রুত শেষ হচ্ছে এবং এখনই সময় একটি গুণগত, সমতাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের।


