বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই সংকটাপন্ন। সরকারের বিনিয়োগের অভাব, চিকিৎসক সংকট, সেবার বৈষম্য এবং দুর্বল শাসন ব্যবস্থা এসব কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অনেকটা বিপদমুক্ত হতে পারছে না। এসব সমস্যার সমাধান করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় ধরনের সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন।
এই কমিশনটির নেতৃত্বে আছেন দেশের খ্যাতনামা স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান। গতকাল এই ১২ সদস্যবিশিষ্ট কমিশনটি তাদের সুপারিশসমূহ বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে একটি প্রতিবেদন আকারে জমা দেয়। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত, সকলের জন্য সমানভাবে পৌঁছানোর একটি পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন।
কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ ছিল, সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (PHC) সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করুক এবং তা জনগণের জন্য বিনামূল্যে সরবরাহ করা হোক। তারা এমন একটি স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা তৈরি করতে চায় যা পুরোপুরি জনগণের স্বার্থে পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি, শহরাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় উন্নত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, এবং স্বাস্থ্যের পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ স্বাস্থ্য সেবা গঠন করা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল সরকারি খাতের মধ্যে একটি বৃহৎ রদবদল আনা। কমিশন প্রস্তাব করেছে, বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে পুনর্গঠন করা হোক এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে শক্তিশালী করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিণত করা হোক। এক্ষেত্রে সরকারী এবং বেসরকারি সকল খাতের সমন্বয় ঘটানোর ওপরও জোর দেয়া হয়েছে।
কমিশন আরও সুপারিশ করেছে যে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে অর্থনৈতিক বরাদ্দ বাড়ানো উচিত এবং এই বরাদ্দ যেন দেশের জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ হয়। আর সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলোর মান উন্নয়ন করার জন্য নিয়মিত মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও গঠন করা প্রস্তাবিত হয়েছে।
এছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে বিশেষায়িত হাসপাতাল তৈরি করার মাধ্যমে, দেশের চিকিৎসা খাতকে আরও আধুনিক এবং সবার জন্য সহজলভ্য করে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা। এতে করে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষদের সংখ্যা কমবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক হবে।
অধ্যাপক ইউনুস প্রতিবেদনটি গ্রহণ করার পর দ্রুত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, “স্বাস্থ্যখাতের সমস্যাগুলো বহুদিনের, যদি আমরা এই প্রতিবেদন থেকে সমাধান বের করতে পারি, তবে তা হবে একেবারে যুগান্তকারী পরিবর্তন।” এমন একটি সংস্কারমূলক প্রস্তাবনা, যেটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে, জনগণের জন্য আরও সাশ্রয়ী, কার্যকর এবং উন্নত করতে সাহায্য করবে, তা যেন দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেজন্য সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।


