“… পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, ধর্ম, অর্থনৈতিক বৈষম্য ইত্যাদি প্রশ্ন ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের থেকে আমাদের ক্রমে আলাদা করেছে এবং আমাদের জাতীয় সংগ্রামের মূল এজেন্ডা তৈরি করে দিয়েছে। ১৯৬০-এর দশকের বিভিন্ন আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও ১৯৬৯ সালের ১১ দফা আমাদের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার স্ফূরণ ঘটায়। ১৯৬৯-৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণাকালে নজিরবিহীন জনসংযোগের মাধ্যমে গোটা জাতিকে শেখ মুজিব স্বাধিকারের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ করেন। পূর্ববঙ্গকে বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করতে থাকেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পাকিস্তানি শাসকেরা যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আমাদের ওপর সামরিক হামলা শুরু করে, তখন সংঘবদ্ধ জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সারা পৃথিবীতে সাড়া জাগিয়েছিল।…কারণ, মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্ববাসী একটি ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জন্য সংগ্রাম হিসেবে দেখেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কী ধরনের রাজনীতি, সরকার, সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে চাই, তারও একটি ধারণা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিবর্তনের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিপরীত এক ব্যবস্থা আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম।
পাকিস্তানে ছিল অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসন, আমরা স্বপ্ন দেখেছি বাংলাদেশে হবে বেসামরিক গণতান্ত্রিক শাসন। পাকিস্তান ছিল ইসলামিক রিপাবলিক। সেখানে ধর্মের অপব্যবহার করে রাজনীতি করা হতো। ধর্মের নামে হয়েছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল-রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। সব ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় থাকবে। ধর্মের নামে সংঘাত হবে না। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছিল ২২টি অতি ধনী পরিবার। আমাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একটি শোষণ ও বৈষম্যহীন অর্থনীতি ও সমাজ গড়ে তুলবে। এসব আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতেই স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়েছিল।
গত পাঁচ দশকে আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। আবার আমাদের অনেক স্বপ্ন, অনেক আকাঙ্ক্ষা এখনো অধরা রয়ে গেছে। আমরা গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ হয়নি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমেনি; বরং বেড়েছে। কিন্তু আমাদের আন্দোলন ও যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা। সেই লক্ষ্য আমরা অর্জন করেছি অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে। অনেকেই মাঝেমধ্যে বলেন, আমরা স্বাধীন হয়ে কী পেলাম? এর উত্তরে আমি বলি, স্বাধীনতাই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পেরেছে বলেই আজ আমরা একটি গর্বিত জাতি হিসেবে পৃথিবীতে জায়গা করে নিতে পেরেছি। স্বাধীনতা আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন এনেছে। স্বাধীনতা আমাদের জনগণের মনে স্বাবলম্বী ও উদ্যোক্তা হওয়ার স্পৃহা গড়ে দিয়েছে। আমরা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়েছি, প্রতিবাদী হয়েছি ।
আমাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোনো ব্যবস্থাই আমরা বেশি দিন সহ্য করিনি। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়েছি। গত বছরের গণ-আন্দোলনেও আমরা একটি স্বৈরাচারী শাসন উৎখাত করেছি। আমরা বারবার সংগ্রাম করে অন্যায্য ব্যবস্থার পরিবর্তন এনেছি। আত্মপ্রত্যয়ী হয়েছি। স্বাধীনতা আমাদের চেতনায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, সেটিই বিরাট এক প্রাপ্তি। “


