স্বল্প মাত্রায় সাহিত্য

শতপুষ্প স্যানাটোরিয়াম
ঋষিণ দস্তিদার

২: বলুন তো ভালো নাইটগার্ড কে? …: সারা রাত ঘুমিয়ে কাটায়…: আর খারাপ জন?: সে ডিউটিতে ঘুমের ওষুধ খাচ্ছে বহু বছর ধরে… তবু ঘুমাতে পারছে না…: সৎ কে?: ভিন্ন ধরনের এক মানুষ… শিস দিয়ে গান তুলতে পারে… ওর হুইসেলটা অনেক সেধে মিনতি করে চোর নিয়ে গেছে…: সবার সততার পক্ষে দাঁড়ানো উচিত…

১৪: উজ্জ্বল দিনগুলোতে হেঁটে হেঁটে পত্রিকার স্টলে যেতাম… নতুন কিছু খবর জানতে ইচ্ছে হতো…: কী ধরনের খবর ? : এই ধরুন… মাথাপিছু ক’টা বাম দল, সীমানা পিলার কেনাবেচা কেমন চলছে, এনকাউন্টারের আনকোরা কোনো প্রেসনোেট এলো কিনা… : জিজ্ঞেস করলে বলতে পারতাম, দুই একটা… : একেকদিন আপনি কোনো কথাই বলতেন না… মাথা গুঁজে পেপার কাটিং সাজাতেন… : আসলে, সানগ্লাসপরা কাউকে আমি চিনতে পারি না… সমস্যাটা এখনো আছে…

৪৭: সার সার ইঁদুরের মিছিল… সুশৃঙ্খলভাবে ওরা এগিয়ে যাচ্ছে পরিচিত মেঠোপথ ধরে… এদিকে বিড়ালের বাড়িতে শুনশান নীরবতা… আগাম খবর ছিল যে, প্রতিরোধী একটা জোয়ার আসছে… মাছের কাঁটা দুধের বাটি ফেলে সে পালাল রাজ্য ছেড়ে… : মিছিলটা তখন বিড়ালের বাড়ি ফেলে আরও সামনে এগিয়ে গেছে… হাসিমুখে টিয়াপাখিরা গাছের ডালে বসে… তারা বিড়ালের প্রস্থান আর এই আগুয়ান লংমার্চ উপভোগ করছিল… দূরে বিস্তীর্ণ বিল… পাকা ধানের হলদে ঢেউ… ক’দিন আগেই ধানকাটা শুরু হলো… আঁটি মাথায় চাষীরা বাড়ি ফিরছে…
ঋষিণ দস্তিদারের কাব্যগ্রন্থ শতপুষ্প স্যানাটোরিয়াম থেকে

চক্কর
সাজ্জাদ চৌধুরী

সালাম সওদাগরের বয়স আশি। তিনি ধর্মপুর গ্রামের সবচেয়ে পাত্তিওয়ালা লোক কিন্তু গ্রামের সবাই তাঁরে জানে বিরাট একটা কিপটা হিসাবে।অথচ কি নাই তার? বাজারে তিনটা দোকান আছে, একটা ভাতের হোটেল আছে, রাইস মিল আর ইটের ভাটা আছে, এমনকি গোপন একটা সুদের ব্যাবসাও আছে। তবে এখন সময়টা বেশ খারাপ – চারিদিকে শুধু করোনা আর করোনা। প্রতিদিন চাইরপাশে করোনায় ধুপধাপ লোকজন মইরা যাইতেছে দেইখা তিনি নিশ্চিত হইলেন শিগগির তাঁরও একই দশা হবে। ভাবতে ভাবতে বাজার থেইকা বাড়ির দিকে যাইতেছিলেন – কপালে খারাবি ছিলো বইলা পথে জামাইল্লার সাথে দেখা হইয়া গেলো। জামাইল্লা বেয়াদপ একটা ছেলে – সারাদিন মাইনষের পাছায় আঙ্গুল দিতে না পারলে ওর ঘুম আসে না। সালাম সওদাগরকে দেইখা সে কান পর্যন্ত একটা হাসি দিলোও আদব কায়দার পরোয়া না কইরা তিন হাত দূরে থেইকা বললো – : ও চাচা, তোমারতো মেলা টেকা কিন্তু তুমি যে কিপ্টা, তুমি মরলে তোমার এতো টাকা খাইবো কে? মুহূর্তেই সালাম সওদাগরের মেজাজ গরম হইয়া গেলো। : হারামজাদা, আমার টাকা দিয়া তোর কাম কি? তোর বইনের বিয়া দিবি? তোরে আমি ঝাঁটা দিয়া পিটামু। জামাইল্লা হাইসা একটু দূরে সইরা দাঁড়ালো কিন্তু একেবারে চইল্যা গেল না। : একটা বুদ্ধি দিমু চাচা? আপ্নের যে বয়স, করোনা হইলে কিন্তু আপ্নের রক্ষা নাই। চাচা, আপ্নে মরার আগেই একটা কুলখানি দিয়া দেন। গ্রামের গরিব লোকজন একবেলা আরাম কইরা খাইলো – আপনি সেইটা দেইখা মরতে পারলেন, আবার সওয়াবও পাইলেনও কোনো লস নাই। : হারামজাদা, আর একটা কথা কইছস তো থাবড়াইয়া তোর দাঁত সব ফালাইয়া দিমু। সালাম সওদাগর লাঠি হাতে একটু আগাইতেই জামাইল্লা ভয়ে দৌঁড়ান দিলো। ঘরে ফিরতে ফিরতে সালাম সওদাগরের মনে হইল জামাইল্লার কথাটা ফেলাই দেওনের মতন না। জীবিত অবস্থায় কুলখানি করাটা কি খারাপ কিছু? ধর্মে কি বারণ আছে? রাইতে ঘুম আসলো না – সারারাত এইটা নিয়া ভাবলেন। সকালে উইঠাই ঘোষণা দিলেন তিনি বাঁইচা থাকতে থাকতেই নিজের কুলখানি করবেন। তার বড়ো ছেলে কইলো – : বাপজান, এইটা কি কও মরার আগে কি কেউ কুলখানি করে? লোকে শুনলেতো তোমারে পাগল ভাববো? : লোকের কথার ধার ধারি নাও আমার টাকায় আমি কুলখানি করুম না চল্লিশা করুম সেইটা আমার ব্যাপার। আমার কি টাকা কি কম আছে? তার ১০ দিন পরেই সালাম সওদাগর ঘটা করে নিজের কুলখানি কইরা ফেললেন। পিপিই গ্লাভস মাস্ক পইড়া বাবুর্চি রান্না করলো, গ্রামের ছেলেরা মাস্ক পইড়া লোকজনরে খাওয়ালো। আর যারা খাইতে আইলো তারাও প্রাইমারি স্কুলের মাঠে একজন থেইকা আরেকজন তিন ফিট দূরে দূরে বইসা বইসা সুন্দর খাইয়া গেলো – খুবই সফল এক আয়োজন। এত সফল আয়োজন দেইখা সালাম সওদাগর ঘোষনা দিলেন : আগামী বছর বাঁইচা থাকলে ইনশাল্লাহ আবারও কুলখানি দিমু। ১০ বছর পরের কথা – দুই বছর ধইরা জামাইল্লা কই কেউ জানেনা, নৌকা লইয়া গঞ্জের বাজারে যাওনের নামে বাইর হইছিলো, আর ফিরে আসে নাই। কেউ কয় জামাইল্লা মইরা গেছে আবার কেউ কেউ কয় বাইচা আছেও সালাম সওদাগর কিন্তু ঠিকই বাইচা আছেন – ভালো মতোই বাইচা আছেন আর প্রতি বছর নিজের কুলখানি দিয়া যাইতেছেন। তিনি একটা ভয়ের চক্করের মইধ্যে পইড়া গেছেন। প্রতি বছর কুলখানি দেয়ার সময় তার মনে হয় – এই বছর কুলখানি না দিলে আগামী বছর তিনি মইরা যাবেনও এই ভয়ে তিনি কুলখানি দেয়া থামাইতে পারতেছেন না।

উলম্ব
আহসান ইকবাল

তার চোখ দু’টি মেলে ছিলো নিরুদ্দেশে; ঘন্টা, ক্ষণ, সময়ের কোন হিসাব ছাড়া। জলজ ভারি মেঘগুলো ভাসছিলো। ডিউটি আওয়ার শেষ হয়ে গেলেও তার ফেরা হয়নি। এমন তো কতই হয়। একটা উটকো ষন্ডা মাছি ঘুরপাক খাচ্ছিলো। দল বেঁধে তারাও আসবে ধোঁয়ার মতো। কি যায় আসে, পুড়িয়ে দেওয়া ভ্যানের ধোঁয়ার কুন্ডলী তাকে ঢেকে দিয়ে গেলেও সে ছিলো ভূক্ষেপহীন। তার চোখের সমানে এই শহর, পল্টন, পুলিশ লাইন, থানা, কালভার্ট, ব্রিজ, ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, রোড-ঘাট, দেশ, সীমান্ত, সরকার, উন্নয়ন বদলে গেছে সংঘাতের ভেতর দিয়ে। সব নতুন হয়েছে। সংঘাত ছাড়া কি কিছু পাল্টায়! বুঝেও, শুধু মাছির সাথে তার সংঘাতে সে যেন ক্লান্ত, অনিচ্ছুক, অনড়। মাছিটা আনেকক্ষণ হাওয়ায় দুলতে থাকা ঘাম-রক্তরস মাখা তার চুলের গতিবিধিতে বিভ্রান্ত হয়েছিলো। এখন মোবাইল ক্যামেরার মুহুর্মুহু ফ্লাশ আর দমকা বাতাসে চুইয়ে নামা ঘামের সাথে রক্তবিন্দুর পতনে পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সে উড়ে পায়ের দিকে, জাঙ্গিয়ার কোনায় শুকিয়ে যাওয়া জমাট ইউরিনের গন্ধে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। পায়ের দিক থেকে নেমে আসা রক্তের শীতল ধারাকে যদিও মাছিটার সন্দেহ হয়। বারুদ গন্ধের ধোঁয়া এলোমেলো করে ভোর আসছে। পুলিশটার মাথার নিচে উৎসুক মানুষও বাড়ছে। সংঘাত, সন্ত্রাস শেষ। এবার ভোরের মতো শান্তি নামবে চরাচর জুড়ে। বদলে যাবে অনেক কিছু। মানুষদের একজন খুব কেতা করে ফুট ওভার ব্রিজের প্রথম ল্যান্ডিং থেকে সূর্যকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে সাবেক পুলিশের ঝুলন্ত শরীরটার ছবি তুলতে চেষ্টা করে, দ্বিতীয় স্বাধীনতার স্মারক হিসাবে। কিন্তু মাছিগুলো বড় জ্বালাতন করায় ঠিক পেরে উঠছে না। জলজ মোষকালো মেঘ সূর্যটাকে ঢেকে দিয়েছে ততক্ষণে। সে হতোদ্যম হয়ে ছবি তোলায় খান্ত দিয়ে ভাবে, শকুন, সারমেয় আর মাছি নামক পতঙ্গের জন্মের গূঢ় কারণ!
লুনা রুশদি’র ‘আর জনমে’ পাঠ প্রতিক্রিয়া
অঞ্জন সরকার জিমি

বহুদিন পর সুখপাঠ্য একটা উপন্যাস পড়লাম একটানা।স্মৃতিকথার ঢঙে লেখা উপন্যাসটা লেখনীর কারিশমায় এত দ্রুত শেষ হয়ে গেছে যে এটাকে ঠিক উপন্যাস মনেই হয় নাই। এক শোয়ায় একটা উপন্যাস শেষ হয়ে গেলে তাকে ঠিক উপন্যাস বলা যায় কী! সন্দেহের অবসান ঘটাতে পৃষ্ঠা সংখ্যা চেক করে দেখলাম ১১২ পাতা!

গল্পটা অনেকটা এইরকম- ব্যক্তিগত জীবনের উথালপাথাল অভিজ্ঞতায় দাঁড়ি টেনে তাবাসসুম নামের একটা মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চাচা চাচির সংসারে এসে থিতু হয়। প্রবাসজীবনের একাকীত্ব কখনও কখনও তাকে বিচ্ছিনতাবোধে আক্রান্ত করলেও অন্যসব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে তুলনামূলক বিচারে তা সয়ে নেওয়ার মতই ছিল। অন্তত তাবাসসুম তা-ই ভেবে এসেছে এতদিন। কিন্তু ২০১৯ সালের মার্চে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চ এলাকার এক মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৫১ জন মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনার অভিঘাত তার উপরও এসে আঁছড়ে পড়ে। বইটার বিষয়বস্তুতে জটিল প্যাঁচের মোচড় নাই কোথাও, সংবেদনকেও মন্দিরের ঘন্টির মতো নাড়া দেয় না। তবে দূরের বাঁশির মতো আলতো কানে বাজে; এবং তা বেশ সমাহিত, সুরেলা। কোথাও গলাগলি প্রেম নাই, অন্যান্য উথলানো আবেগের আঠাও নাই; ঘটনার পরম্পরার সাথে চরিত্রের আত্মনিমগ্নতাকে কোনোপ্রকার জবরদস্তি ছাড়াই ঠিকঠাক গেঁথে দিয়েছেন লেখক। বইটা একটা টলটলে দিঘি, চরিত্ররা নাইতে নেমেছে। তাদের গায়ে মাখা সাবানের সুঘ্রাণ পাঠকের নাকে এসে লাগতে বাধ্য।
লুনা রুশদি’র ‘আর জনমে’ প্রকাশ করেছে প্রথমা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন