স্বল্প মাত্রায় সাহিত্য , গল্প : হেডফোন , নাসিফ আমিন

গল্পটা শুরু হতে না হতেই বিজ্ঞাপন বিরতি। রূঢ় জীবনের বিজ্ঞাপন। সেখানে এক বিশেষ মলমের কথা বলল। বাজারে এসেছে নতুন। ঠোঁটে লাগাতে হয়। জীবনকেই এখন মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। নিদান হিসেবে জীবন্মত নামক এক নতুন অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় প্রকাশ, এই অস্তিত্বের দিকে চলে গেলে আপাতত বেঁচে থাকা সম্ভব। পরীক্ষামূলক ভাবে মলমটি বাজারে ছেড়েছে জনদরদী এক বিত্তশালী সংস্থা।

গল্পটা শুরু হয়েছিল চোখ আর কানকে নিয়ে। এর মাঝেই বিজ্ঞাপন আমাকে মনে করিয়ে দিল মলম লাগানোর কথা। সাথে একটা দার্শনিক প্রশ্নও ছুঁড়ে দিল। প্রশ্নটি হল, বেঁচে না থাকলে আমরা কি আর গল্প শুনতে পাবো?
এই প্রশ্নের সুরাহা করতে বসে ঠোঁটে মলমটা লাগালাম। ঠোঁটে আরাম লাগল। ঠোঁট অবশ হয়ে গেল। উপরের ঠোঁট নিচের ঠোঁটের উপর নিথর পড়ে রইল। তারপরই শুরু হল গল্পটা। গল্পটার নাম মৌনব্রত। গল্পটা যে লোকটাকে নিয়ে তার নাম নিবারণ বিশ্বাস। তিনি তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে একটা গান শুনবার হেডফোন কিনেছেন। গানগুলো ওই হেডফোন দিয়ে শুনলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিজ নিজ স্থানে থেকে সপ্রাণ হয়ে উঠে। তারা কথা বলে। একমাত্র ঠোঁট ছাড়া। ঠোঁট কেন আর সপ্রতিভ হয় না – এর একটা গল্প তখন শুরু হল।

গল্পটা এমন যে, লোকটা, মানে বিশ্বাস যার নাম, তিনি একবার আলেয়া জান্নাত নামে একজনের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন। উনার ডাক নাম প্রেম। কিন্তু এই নাম সেকেলে বলে নিজেকে সমসাময়িক রাখতে ‘প্রেম’ নামটি তিনি কাউকে তেমন বলেন না। কেবলমাত্র হৃদয়ের ঘনিষ্ঠজনদের বলেন। যেমন বিশ্বাসকে বলেছিলেন; নিবারণ বিশ্বাসকে। তাদের এক জনপরিসরে দেখা হয়েছিল। অনেক লোক সমাগম হয়েছিল সেখানে। ওখান থেকে তারা এক সাথে বাসায় ফিরেছিলেন রাতে। পথে তাদের ছিনতাইকারী আক্রমণ করে। অস্ত্রের মুখে জানতে চায়, জীবন নাকি সত্য, কোনটা তারা দিতে চান।

বিশ্বাস ও প্রেম দুজনেই সত্য সমর্পণ করল। ফলে তারা জীবন নিয়ে ফেরত এলেন। এরপর তারা দুজন বেশ সুন্দর সময় কাটাতে লাগলেন। মুহূর্ত নামক একটা জিনিস তারা আবিষ্কার করল, যেটা দুজনে একসাথে পান করলে সময় সুন্দর হতে থাকে। বিষয়টা বেশ চমকপ্রদ। এরপর থেকে পৃথিবী বেশ মুহূর্তময় হয়ে উঠল। মুহূর্ত আগেও ছিল পৃথিবীতে। মূলত অনাবিষ্কৃত ছিল। আবিষ্কৃত হওয়ার পর জানা গেল পৃথিবী মূলত মুহূর্তের খনি। হঠাৎ একদিন জানা গেল, মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহগুলো মুহূর্ত সংকটে ভুগছে। এই সংবাদ প্রকাশের পরদিন থেকে প্রেম উধাও হয়ে গেল। তার টিকিটিও আর দেখা গেল না। বিশ্বাস নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। ধীরে ধীরে জানা গেল, পৃথিবীতে অজস্র মুহূর্ত চুরির ঘটনা ঘটেছে। ভিনগ্রহ থেকে এক বিশেষ জাতের প্রাণী ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মবেশে মুহূর্ত চুরি করে নিয়ে গেছে বহুজন থেকে ছদ্মবেশ হিসাবে তারা সাবেকিয়ানাকে উপজীব্য করেছিল।

সাবেকের প্রতি পৃথিবীর মানুষের এক আদি অকৃত্রিম টান আছে। কিন্তু সেখানে তারা ফিরতে পারে না। এই বাসনা আর অপারগতার মাঝখানে ঝুলে থাকতে থাকতে পৃথিবীর মানুষ নস্টালজিক হয়। নস্টালজিয়া বা স্মৃতিকাতরতা এক ভয়ংকর রোগ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল গত শতাব্দীর মানুষের কাছে। বর্তমান শতাব্দীর মানুষ ধীরে ধীরে সেই রোগ থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে ভিন্ন ভিন্ন তরিকায়। তো বিশ্বাস যে দাগাটি খেলেন, সেই দাগায় তিনি নিজেকে হারিয়ে একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। কোনো কথা বলতে পারলেন না। একেবারে নির্বাক হয়ে গেলেন।এমতাবস্থায় তিনি তার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে একটা হেডফোন কিনলেন। এই বিশেষ হেডফোন দিয়ে সব কিছু সপ্রাণ করে তোলা যায়। তিনি ভেবেছিলেন এই হেডফোনের সাহায্যে তিনি তার ঠোঁটকে সপ্রাণ করে তুলতে পারবেন। কিন্তু পারলেন না। ব্যর্থ হলেন। তবে একটা ঘটনা ঘটল। তিনি হেডফোনের বাট দুটো দুই চোখের উপর রাখলেন। এতে করে চোখ সপ্রতিভ হয়ে উঠল। চোখ শুনতে শুরু করল। চোখ শুনতে শুরু করার পর থেকে চোখের মনে হতে লাগল সে আসলে এতদিন জন্মবধির ছিল। সে দেখতে দেখতে ক্লান্ত। দেখার দায়িত্ব থেকে সে নিষ্কৃতি চায়।

এই উপলব্ধির কথা চোখ তার বন্ধু কানকে বলল। কান সব কিছু শুনে বলল, সেও শুনে শুনে ক্লান্ত সেও শোনার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি চায়। জন্মান্ধ কান এবং জন্মবধির চোখ বিশ্বাসের কাছে এই দাবি পেশ করল যে, তারা স্ব স্ব দায়িত্বের রদবদল চায়। বিশ্বাস তাদের দাবি মেনে নিলেন। এ দাবি মেনে নেওয়ার পর থেকে বিশ্বাস পাল্টে গেলেন। তিনি আবার জীবন ফিরে পেলেন। গল্পটা শেষ হয় এক দুঃসংবাদ দিয়ে। সংবাদে প্রকাশ, জীবন নিজেই এখন মহামারীতে পরিণত হয়েছে। গল্পটা শেষ হওয়ার পর আমার সম্বিত ফিরল। গল্প আর আমার বর্তমান বাস্তবতাকে আমি সম্পূর্ণ গুলিয়ে ফেললাম। মনে হল, এতক্ষণ আমি কি আসলে নিজের গল্পই দেখছিলাম, শুনছিলাম কিম্বা পড়ছিলাম? তীব্র ভয়ে আমি চিৎকার করে উঠতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। আমার ঠোঁট অবশ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন