সব স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক-সহ অন্যান্য বহু পণ্যের আমদানি বন্ধে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতের বেশির ভাগ মূলধারার সংবাদমাধ্যম সেটিকে একটি ‘রেসিপ্রোকাল মুভ’ বা ‘পাল্টা পদক্ষেপ’ হিসেবেই বর্ণনা করছে।
তাদের দাবি, সম্প্রতি ঢাকা ভারতের রফতানিতে যেসব অশুল্ক বাধা (নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার) আরোপ করেছে, তার জবাবেই দিল্লির এই সিদ্ধান্ত – ভারত নিজে থেকে এটি নেয়নি।
বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সব নিত্যনতুন কড়াকড়ি যে দুই দেশের মধ্যেকার কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্রমাবনতিরই প্রতিফলন, তা নিয়েও ভারতের প্রধান খবরের কাগজ বা টিভি চ্যানেলগুলোর মধ্যে কোনও দ্বিমত নেই।
ভারতীয় সংবাদপত্র ‘দ্য হিন্দু’-র খবরে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক চীন সফরে মুহাম্মদ ইউনূসের করা মন্তব্যের পটভূমিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘একটি বার্তা দিতেই’ এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে পত্রিকাটিকে জানানো হয়েছে।
‘দ্য হিন্দু’কে সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, সম্প্রতি ভারত থেকে কটন ইয়ার্ন আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক কড়াকড়ি চালু করেছে – স্থলবন্দরগুলোতে এই সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে শুধু সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানি করতে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, তা ছাড়া ভারতের পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে বাংলাদেশের দিকে ‘অ্যাগ্রেসিভ ইনস্পেকশন’ বা কড়া তল্লাসির মুখে পড়তে হচ্ছে বলেও দিল্লি লক্ষ্য করেছে। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবেই ভারত শনিবারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ওই কর্মকর্তা দাবি করেন।
ভারতের প্রথম সারির চ্যানেল এনডিটিভি বলছে, ভারতের অ্যাপারেল বা তৈরি পোশাক রফতানিকারীরা বহুদিন ধরেই সরকারের কাছে আর্জি জানিয়ে আসছিলেন বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হোক।
প্রথমে তৃতীয় দেশে রফতানির জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে এবং তারপর স্থলবন্দর বন্ধ করে দিয়ে সরকার তাদের দাবিই কার্যত মেনে নিল বলে এনডিটিভি-র প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। টেক্সটাইল খাতে ভারত ও বাংলাদেশকে পরস্পরের ‘বড় প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলেও বর্ণনা করা হয়েছে।
চীনের মাটিতে দাঁড়িয়ে ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসের মন্তব্যও ভারত ভালভাবে নেয়নি, সে কথাও উল্লেখ করেছে এনডিটিভি। ভারতের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘ব্লো টু বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশের জন্য বড় আঘাত) বলে বর্ণনা করেছে।
দিল্লিতে একজন সরকারি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেছেন, “দ্বিপাক্ষিক এনগেজমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের সুবিধামতো ‘চেরি-পিক’ করবে (মানে শুধু নিজের পছন্দেরটা বেছে নেবে) কিংবা ভারতের বাজারে অ্যাকসেস পাওয়া যাবেই বলে ধরে নেবে – এটা মেনে নেওয়া যায় না।”
তবে ওই কর্মকর্তা এটাও জানিয়েছেন যে ভারত এই সব ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত – কিন্তু “পরিবেশে যাতে কোনও তিক্ততা না থাকে সেটা নিশ্চিত করা বাংলাদেশেরই দায়িত্ব।”
দ্য ইকোনমিক টাইমস পত্রিকা বাণিজ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘জিটিআরআই’-এর একটি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “ঢাকার ‘ডিপ্লোম্যাটিক পিভট’ বা কূটনৈতিক ভারসাম্য যে চীনের দিকে ঝুঁকছে – ভারতের এই সব বিধিনিষেধ তারই উত্তর বলে মনে করা যেতে পারে।”
ভারতের প্রথম সারির আর একটি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত বছরের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের অপসারণের পর এই সিদ্ধান্তকে ঢাকার বিরুদ্ধে দিল্লির সবচেয়ে শক্তিশালী ‘পুশব্যাক’ (ধাক্কা)-গুলোর অন্যতম বলে বর্ণনা করেছে।
বেইজিং-এর মাটিতে দাঁড়িয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতকে মুহাম্মদ ইউনূসের ‘স্থলবেষ্টিত’ বলে বর্ণনা করার মাত্র মাসদেড়েকের মধ্যেই যে এই সিদ্ধান্ত এল, সেটাও মনে করিয়ে দিয়েছে ওই পত্রিকাটি। “চীনের অর্থনীতির সম্প্রসারণের পটভূমিতেই” যে অধ্যাপক ইউনূস ওই মন্তব্য করেছিলেন, সে কথাও তারা উল্লেখ করেছে।


