সৌরশক্তি দীর্ঘদিন ধরে পরিচ্ছন্ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল এটি কেবলমাত্র দিনের আলোয় কাজ করে। রাত নামলেই সৌর প্যানেল কার্যক্ষমতা হারায়, ফলে ব্যাটারি বা বিকল্প শক্তির উৎসের উপর নির্ভরতা বাড়ে। এই বাস্তবতা বদলে দেওয়ার চমকপ্রদ এক উদ্ভাবন এনেছেন Stanford University-এর গবেষক দল।
এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি radiative cooling একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পৃথিবীর পৃষ্ঠতল থেকে উত্তাপ মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। দিনে সূর্যের আলো জমা হয় এবং রাতের বেলায় সেই তাপ ধীরে ধীরে বের হয়ে যায়। স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা এই তাপ বিকিরণের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা।
তারা থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর (Thermoelectric Generator বা TEG) নামক একটি যন্ত্র যুক্ত করেছেন সাধারণ সৌর প্যানেলের পেছনে। রাতের বেলায় প্যানেলের উপরিভাগ ঠান্ডা হয়ে যায়, কিন্তু নিচের দিক অপেক্ষাকৃত গরম থাকে এই তাপমাত্রার পার্থক্য থেকেই TEG বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।
কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়?
গবেষণা অনুসারে, প্রতি বর্গমিটার সৌর প্যানেলে প্রায় ৫০ মিলিওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়েছে। সংখ্যাটা শুনতে ছোট মনে হলেও, এটি কম শক্তিচালিত এলইডি বাতি, সেন্সর বা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের মতো ডিভাইস চালানোর জন্য যথেষ্ট।
এই গবেষণা ২০২২ সালের দিকে Applied Physics Letters জার্নালে প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত হলেও ২০২৫ সালে তা বাস্তব পরীক্ষায় বড় পরিসরে আলোচনায় আসে। এতে প্রমাণ হয় প্রযুক্তিটি শুধু গবেষণাগারে নয়, বাস্তব পরিস্থিতিতেও কাজ করতে সক্ষম।
কেন এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে সৌর প্যানেল ব্যবহারের সবচেয়ে বড় বাধা হলো এনার্জি স্টোরেজ। দিনের বেলা উৎপাদিত বিদ্যুৎ রাতের জন্য ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করতে হয়, যা ব্যয়বহুল, টেকসই নয় এবং পরিবেশবান্ধবও নয় সবসময়। এই নতুন প্রযুক্তি নিরবচ্ছিন্ন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি করে। বিশেষ করে অফ-গ্রিড গ্রামাঞ্চল যেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই বা অনিয়মিত সেখানে এমন প্রযুক্তি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
সীমাবদ্ধতাও আছে, এই উদ্ভাবন আশাব্যঞ্জক হলেও এর কিছু বাস্তব বাধা রয়েছে। কার্যকারিতা সীমিত ৫০ মিলিওয়াট শক্তি বড় যন্ত্র চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। অতিরিক্ত TEG ইউনিট যোগ করায় খরচ বেড়ে যায়। দিনে যেমন সৌর প্যানেলের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকে, রাতে তা অনেক কম।
তবে গবেষকেরা বলছেন, প্রযুক্তি ধীরে ধীরে পরিপক্ব হবে। ভবিষ্যতে নতুন ধরণের থার্মোইলেকট্রিক উপাদান, উন্নত তাপ নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন খরচ কমালে এই প্রযুক্তি আরও ব্যবহারিক হয়ে উঠতে পারে।
এই উদ্ভাবন দেখিয়েছে সৌরশক্তিকে আর কেবল দিনের আলোতে সীমাবদ্ধ রাখার সময় ফুরিয়ে এসেছে। প্রযুক্তির ক্রমাগত অগ্রগতিতে আমরা এমন এক বিশ্ব কল্পনা করতে পারি যেখানে দিন-রাত নির্বিশেষে নবায়নযোগ্য শক্তির সঞ্চালন অবিচ্ছিন্ন থাকবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে বিশ্ব যখন দৌড়াচ্ছে, তখন Stanford-এর এই গবেষণা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।


