স্টুডিও ব্যবস্থার অবসান ঘটাতে পারে , রায়ান কুগলারের Sinners

২০২৩ সালের শীতকালে হলিউডে এক রহস্যময় চিত্রনাট্য ঘুরতে থাকে, যার নাম Sinners। দেখতে দেখতে এটি একটি বেনজির বাজার প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। নাটকীয়তা, থ্রিলার, সারভাইভাল হরর, ব্লুজ মিউজিক, যৌনতা, দক্ষিণী মার্কিন অকাল্ট সংস্কৃতি এবং রিভারড্যান্সিং ভ্যাম্পায়ার সব মিলিয়ে এমন অসাধারণ মিশ্রণ আগে কখনও দেখা যায়নি। তবে Sinners চলচ্চিত্রটিকে ঘিরে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, তার কেন্দ্রে কেবল গল্প নয় বরং এই প্রজেক্টটির সৃষ্টিশীল ও ব্যবসায়িক কাঠামো দাঁড় করানোর পেছনের ব্যক্তি, রায়ান কুগলার এবং তাঁর চুক্তিভিত্তিক শর্তাবলি।

Sinners এর গল্প গড়ে উঠেছে জিম ক্রো যুগের মিসিসিপি অঞ্চলে, যেখানে বর্ণবৈষম্য ছিল সাংবিধানিকভাবে বৈধ। কেন্দ্রীয় চরিত্র দুই যমজ ভাই Smoke এবং Stack, যারা একসময় অপরাধের জগতে জড়িত থাকলেও পরে একটি জুক জয়েন্ট চালায় — যেখানে ব্লুজ মিউজিক বাজে, অন্ধকারে মানুষ জমায়েত হয়, এবং অলৌকিকতা ঘুরে বেড়ায়। সিনেমায় রয়েছে ডজনখানেক রিভারড্যান্সিং ভ্যাম্পায়ার, অর্থাৎ নাচতে থাকা ভয়ংকর রক্তচোষা প্রাণী, যা দক্ষিণের ধর্মীয় অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের এক রূপক।

এই গল্প শুধুই কাল্পনিক নয়, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পুনঃপ্রতিনিধিত্ব। কুগলার এখানে আমেরিকার ইতিহাস, সংগীত, যৌনতা ও ভয়ের এক সংকর মিশ্রণে একটি নতুন ঘরানার জন্ম দেন — যাকে বলা যেতে পারে “ব্ল্যাক সারভাইভাল গথিক”। হলিউডে সাধারণভাবে পরিচালকরা স্টুডিওর অধীনে কাজ করেন এবং তাঁদের সৃষ্টিশীলতা বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু Sinners–এর ক্ষেত্রে কুগলার স্পষ্টভাবে কয়েকটি ‘শর্ত’ আরোপ করেন, যা তাঁকে কেবল পরিচালক নয়, একজন স্বাধীন শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

কুগলার দাবি করেন, সিনেমার চূড়ান্ত সম্পাদনা তিনি নিজেই করবেন, স্টুডিও নয়। এটি ‘Final Cut’ নামে পরিচিত এবং খুব অল্পসংখ্যক পরিচালকই এই ক্ষমতা পান — যেমন ক্রিস্টোফার নোলান, কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনো বা মার্টিন স্কোরসেসি। এই দাবি স্পষ্ট করে দেয় যে কুগলার কেবল টাকা নয় বরং নিরাপদ শিল্পস্বাধীনতা চান। তিনি আরও দাবি করেন সিনেমা মুক্তির প্রথম দিন থেকেই আয়ের ভাগ পাবেন — সাধারণত পরিচালক বা অভিনেতারা মুনাফা তখনই পান, যখন স্টুডিও সমস্ত খরচ উসুল করে। কিন্তু কুগলার স্টুডিওর লাভ-লোকসানের বাইরে গিয়ে নিজের বাজারমূল্যকে সরাসরি নগদ রূপে দাবি করেন। এটি শিল্পী হিসেবে তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং ক্ষমতার পরিচায়ক।

সবচেয়ে আলোচিত ও বহুল আলোচ্য শর্ত হলো, ২৫ বছর পর সিনেমাটির মালিকানা তাঁর কাছে ফিরে আসবে। এটি একটি বিপ্লবাত্মক ধারণা। হলিউডে সাধারণভাবে সিনেমার স্বত্ব চিরকাল স্টুডিওরই থেকে যায়। কিন্তু কুগলার দেখিয়ে দিলেন যে একজন পরিচালকও চাইলে নিজের নির্মিত শিল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদী অধিকার রাখতে পারেন। এই মালিকানা ফেরত পাওয়ার ধারণা শুধু অর্থনৈতিক নয় এটি এক ধরনের ঐতিহাসিক সংশোধন ও কালচারাল জবাবদিহিতা। কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের দীর্ঘদিন বঞ্চিত রাখা হয়েছিল তাঁদের সৃষ্টির মালিকানা থেকে। কুগলারের দাবি সেই ইতিহাসের প্রতিক্রিয়া।

কুগলারের দীর্ঘদিনের সৃষ্টিশীল সঙ্গী মাইকেল বি. জর্ডান এখানে একসঙ্গে Smoke ও Stack নামে দুই চরিত্রে অভিনয় করছেন। তাঁরা শুধু যমজ ভাই নয়, একই আত্মার দুটি বিপরীত দিক। একদিকে প্রেম, স্বাধীনতা, অপরদিকে লোভ, প্রতিশোধ। এই দ্বৈত চরিত্রের মাধ্যমে জর্ডান কুগলারের থিম ব্ল্যাক ট্রমা, পরিচয়, পরিবার ও নৈতিক দ্বন্দ্ব — আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। যখন একটি সিনেমার প্রাথমিক চুক্তিই $৯০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায়, তখন সেটি কেবল বিনোদন নয়, একটি বাজার কাঠামোর উত্তাল ঢেউ। তবে Sinners এর সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে এর মডেল। যেখানে একজন পরিচালক বিনোদন, স্বাধীনতা ও দীর্ঘমেয়াদি মালিকানা একত্রে দাবি করছেন।

Sinners শুধুমাত্র একটি নতুনধারার সিনেমা নয়, বরং এটি আজকের হলিউডে সৃজনশীল স্বাধীনতা বনাম কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ দ্বন্দ্বের এক জ্বলন্ত প্রতীক। রায়ান কুগলারের মতো পরিচালকরা আজ দেখাচ্ছেন, কীভাবে শিল্প ও বাণিজ্যের মাঝখানে একজন সচেতন শিল্পী নিজের পথ গড়ে নিতে পারেন, নিজের স্বপ্নকে বাজারের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এক নতুন যুগের সূচনা করতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন