জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ সমাবেশে দলের শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম লিখিত ঘোষণাপত্র পাঠ করেন, যেখানে স্পষ্টভাবে বাংলাদেশে একটি সেকেন্ড রিপাবলিক বা দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এই নতুন দলটি গণপরিষদ (Constituent Assembly) নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের কথা বলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে – দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র বলতে বোঝায় গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তর, যা একটি বিপ্লব বা গণজাগরণের পর সংবিধান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্লিখন বা সংস্কারের মাধ্যমে গঠিত হয়। সেকেন্ড রিপাবলিক ধারণাটি দিয়ে বিভিন্ন দেশে তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ পর্বকে বোঝানো হয়, যখন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সরকার ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, “এটি প্রথম প্রজাতন্ত্রের ব্যর্থতাগুলো সংশোধন করে সংস্কার ও নতুন সংবিধানের মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সমগ্র রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনকে বোঝায়।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক সাব্বির আহমেদ বলেন – নতুন দলের নেতারা মনে করেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করলেও পরে তা হারিয়ে ফেলেছে। ২০২৪ সালের গণজাগরণের মাধ্যমে জনগণ আবার তাদের মালিকানা পুনরুদ্ধার করেছে, তাই তারা এখন দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে চায়। সাধারণত নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সেকেন্ড রিপাবলিকের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল ফ্রান্স। স্পেন, অস্ট্রিয়ার ইতিহাসেও এর নিদর্শন আছে। ফরাসি বিপ্লবের পর ১৮৪৮ সালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে ফ্রান্সের দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভাতিজা লুই নেপোলিয়ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, কিন্তু পরে ১৮৫১ সালে এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নিজেকে সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ঘোষণা করেন। এর ফলে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের সূচনা ঘটে। এর আগে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর ১৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সকে প্রথম রিপাবলিক বা জনতার শাসনের রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রথম রিপাবলিকের মেয়াদ ছিল ১৭৯২ থেকে ১৮০৪ খ্রিষ্টাব্দ। ১৮০৪ সালে দেশটি আবার স্বৈরতান্ত্রিক রাজশাসনের কবলে পড়ে এবং ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এক অস্থিতিশীল রাজতন্ত্র চলে। ফ্রান্স এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রজাতন্ত্র পার করেছে, যার মধ্যে সর্বশেষটি ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৩১ সালে স্পেনের রাজা ত্রয়োদশ আলফোনসো গণভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা হারান এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কার চালু করা হয় এবং গির্জা ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ ঘটে। তবে, ১৯৩৬ – ১৯৩৯ সালের স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের পর এই প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ে এবং ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টি ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ কীভাবে গড়ে তুলতে চায় – তা জানতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কথা বলেছে নতুন দলের যুগ্ম সদস্য সচিব মো. মইনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) – এর সাথে। পূর্বতন সংবিধান এবং রাষ্ট্রকাঠামোকে পুরোপুরি বদলে দেওয়ার মাধ্যমে ফ্রান্সের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা হলেও এনসিপির ঘোষণাপত্রে এটাকে ‘ধারণাগত’ বিষয় হিসেবে রাখার কথা বলেন তুহিন খান। যা পরবর্তী সময় নানান রাজনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করবে দলটি।
তুহিন খান বলেন, “আমরা ফ্রান্স বা অন্যান্য দেশের মত সরাসরি সেকেন্ড রিপাবলিকে যাচ্ছি না হয়ত, কিন্তু আমাদের ঘোষণাপত্রে সেকেন্ড রিপাবলিকে যাওয়ার মত উপাদান আছে।” এক্ষেত্রে অন্তর্বতীকালীন সরকারের গঠিত সংবিধান সংস্কার কমিটির সুপারিশগুলোকে ভিত্তি ধরে গণপরিষদের মাধ্যমে নতুন সংবিধান প্রণয়নের প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলেন তিনি। গত বছর অক্টোবরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের অপসারণ চেয়ে বিক্ষোভের সময় পাঁচ দফা দিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যেখানে প্রথম ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আনে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটি। বাংলাদেশে সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে।


