“সুলতানার স্বপ্নের সেই লেডিল্যান্ডে নারীর ক্ষমতা হলো ভালোবাসা, সত্য ও সময়ের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক” : সালওয়াহ চৌধুরী, লেখিকা, মিডিয়াম

বেগম রোকেয়ার “সুলতানার স্বপ্ন” ২০শ শতকের শুরুর দিকে লেখা, এটি এমন একটি মাতৃশাসিত সমাজের কথা বলে যেখানে নারীরা যেকোনো পটভূমির হয়ে থাকুক না কেন, তারা স্বাধীন ও সম্মানিত। গল্পটি বেশ কয়েকবার পড়ার পর আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, এই সাহিত্যকর্মটি কি সত্যিই কোনো স্বপ্নের বর্ণনা, নাকি এটা সুলতানার সেই জায়গার বাসনার প্রতিফলন, যেখানে শুধু নারীরা শাসন করবে? এমন এক দেশ যেখানে নারীরা পার্দার আড়ালে নয়, মুক্ত ও স্বাধীন!

গল্পে যে কাল্পনিক জায়গাটির নাম ‘লেডিল্যান্ড’, তা থেকেই স্পষ্ট যে নারীর ক্ষমতায়ন সেখানে বিরাজমান। গল্পে সমানাধিকারের বা উভয় লিঙ্গের সমান অধিকারের কথা বিশেষ ভাবে বলা হয়নি। বরং নারীরা সেখানে শাসক এবং পুরুষরা বন্দী। যেমন বাক্যগুলো—‘পুরুষরা তাদের নিজের জায়গায় থাকা উচিত’, ‘যতক্ষণ রাস্তায় পুরুষ থাকবে ততক্ষণ নিরাপদ নয়…’—এই ধরনের বাক্য পড়ে বোঝা যায়, এটি নারী শক্তির উল্টোদিকে পুরুষ দমনকেই তুলে ধরেছে।আমার মতে এখানে নারীবাদের শক্তিশালী দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বরং লিঙ্গের ভূমিকা পাল্টে যাওয়ার গল্প বলা হয়েছে যেখানে নারীরা শাসন করছে আর পুরুষরা বাড়ির ভিতর আটকে।

নারীবাদ মূলত নারী-পুরুষ উভয়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমানাধিকারের কথা বলে, কিন্তু “সুলতানার স্বপ্ন” এ বেগম রোকেয়া দেখিয়েছেন কিভাবে পুরুষদের ধীরেধীরে ঘরের মধ্যে আটকে রাখা হলো এবং তারা ঘরকন্না কাজ করলো। গল্পের সিসর সারা পুরুষদের পাগল হিসেবে তুলনা করেছেন, হাতি ও সিংহের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে শুধুমাত্র শারীরিক শক্তি সবকিছু নয়, যা পুরুষেরা সবচেয়ে বেশি ধারণ করে। তবে লেডিল্যান্ডে পুরুষেরা সামরিক কৌশলে ব্যর্থ হওয়ায় নারীরাই সেই দায়িত্ব নিলেন তাদের জাদুকরী ইউটোপিয়া রক্ষার।

নারীদের শাসনের আকাঙ্ক্ষা প্রতিটি সংলাপে প্রকাশ পেয়েছে। বারবার সিসর সারা বলেছে পুরুষরা কাজের কিছুই পারে না, তাদের দরকার নেই, এমনকি সূচ-সুতা কাজেও তাদের বিশ্বাস নেই, কারণ তারা ধৈর্যশীল নয়।

১৯০৫ সালে লেখা এই গল্পটি নারীদের জন্য একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি। সেই যুগে একজন নারী লেখক হিসেবে পুরুষদের ঘরের ভিতরে সীমাবদ্ধ করে রাখার মতো বিষয় লেখা খুবই সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল এবং হয়তো এটি তখন বিতর্ক ও আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। একজন ক্ষমতাবান নারী হিসেবে আমি মনে করি, এই গল্পটি পুরুষদের ওপর একটু কঠোর। বাংলাদেশে যেখানে অনেক বড় নেত্রী আছেন, রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, সেখানে এই গল্প হাস্যরসের সঙ্গে পুরুষদের বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতাকে হালকা করে উপস্থাপন করেছে।

গল্পের বিজ্ঞানের দিকটিও অত্যন্ত প্রতীকী। যেহেতু পুরুষরা রাস্তায় বেরোতে পারছিল না, তাই পুরো এলাকা একটি বিশাল উদ্যানের মতো ছিল, যেখানে ভবিষ্যতের পরিবেশ বান্ধব যানবাহন চলাচল করতো। শেষাংশে বলা হয়েছে, লেডিল্যান্ডের সবাই প্রকৃতির প্রদত্ত জিনিস নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল, যা তাদের নিরস্ত্র ও অহিংস করে তোলে। সেখানে বিজ্ঞানাগার ও জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণাগার স্থাপিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে নারীরাও যেকোনো ক্ষেত্রে সফল হতে পারে হোক সেটা যুদ্ধ জয় করা, মনোমুগ্ধকর সূচিকর্ম বা সর্বত্র বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। কারণ তাদের রয়েছে ভালোবাসা ও সত্যের ধর্ম এবং সময়ের মূল্যবোধ, যা পুরুষদের নেই।

সারাংশে বলতে গেলে, এই সাহিত্যকর্মের কিছু অংশ আজও প্রাসঙ্গিক। হয়তো এটি আমাদের প্রিয় বেগম রোকেয়ার সেই দূরদৃষ্টির ফল, যা আমাদের এমন এক জগতের দিকে নিয়ে এসেছে যেখানে নারীরা ছোট ছোট আকারে সুলতানার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন