বিশ্বের সামনে ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ এর ধারণা উপস্থাপন করা ভুটান এখন এক বড় সমস্যার মুখোমুখি। বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ক্রমবর্ধমান গড় আয়ু এবং ৩০ বছর উন্নয়নশীল অর্থনীতি থাকা সত্ত্বেও ভুটানের জনসংখ্যার প্রায় ৯% বিদেশে চলে গেছে, যার বেশিরভাগ তরুণ। ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুক কিউবায় এক নিরপেক্ষ জাতির শীর্ষ সম্মেলন থেকে ফেরার পথে, ভারতের একটি বিমানবন্দরে সাংবাদিকরা তাকে ভুটানের মোট জাতীয় উৎপাদন (জিএনপি) সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। রাজা তখন বলেন, ‘আসলে, ভুটানে আমাদের জন্য জিএনপি’র চেয়ে গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (মোট জাতীয় সুখ) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
বাক্যটি দ্রুত আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস বাড়ানোই ভুটান সরকারের প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে, যা বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ) স্বীকার করে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ তবে প্রবৃদ্ধি হতে হবে টেকসই।’ পাঁচ বছর পর পর জরিপে ভুটান জুড়ে মানুষের সুখের মান পরিমাপ করা হয়; ফলাফল বিশ্লেষণ করে সরকারি নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস মুহূর্তের সুখের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়,’ বলেন তোবগে। ভুটান যে সুখকে গুরুত্ব দেয় তা হলো, সন্তুষ্টি, জীবন এবং নিজের প্রতি সুখী থাকা।
বর্তমানে ভুটান একটি ‘আউটমাইগ্রেশন’ সংকটে, যেখানে তরুণরা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। কোভিড-১৯ মহামারি ভুটানের অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বিশেষত পর্যটন খাতকে। আর্থিক পুনরুদ্ধার ধীর গতির। ফলে অনেক ভুটানি, বিশেষত তরুণরা, উচ্চ বেতনের চাকরি খুঁজতে বিদেশে চলে গেছেন। তাদের ইংরেজিতে দক্ষতা থাকায় অস্ট্রেলিয়ায় অনেকেই নিম্নমানের কাজেও ভালো পারিশ্রমিক পাচ্ছে। ‘এটি এক ধরনের অস্তিত্ব সংকট,’ মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তোবগে।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন, এই দেশত্যাগের পেছনে এক ধরনের বেমানান সাফল্য কাজ করছে। ‘গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস’ এর সাফল্যই বিদেশে ভুটানের তরুণদের চাহিদা বাড়িয়েছে। এটি ভুটানের জন্য একটি কঠিন পরিস্থিতি। ভুটানের প্রথম পত্রিকার সম্পাদক ও পরে তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী দাশো কিনলে দরজি দেশটির জনগণকে এক ধরনের ‘শঙ্কিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ভুটান এমন একটি দেশ, যা ভারত ও চীনের মাঝে অবস্থিত। এর সামরিক শক্তি কিংবা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষমতা নেই।
এই সংকটে ভুটানের রাজা এক সাহসী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন, যাতে মানুষদের ফিরিয়ে আনা যায়। রাজা দক্ষিণ ভুটানে একটি নতুন শহর গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যেখানে থাকবে ভিন্ন নিয়মকানুন, যা দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভুটানি মূল্যবোধকে সমর্থন করবে। নতুন শহরটির নাম হবে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি। এটি ডিজাইন করছেন ডেনিশ স্থপতি বিয়ারকে ইংগেলস। শহরটি নদীগুলোর মধ্যে বসবাসের উপযোগী এলাকা তৈরি করবে, যেখানে বিশেষ ধরনের সেতু দিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গা সংযুক্ত হবে। এসব সেতু জনসাধারণের জন্যও ব্যবহারযোগ্য হবে।
যেমন একটি সেতু থাকবে বুদ্ধিস্ট সেন্টারের জন্য, অন্যটি স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার জন্য এবং আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। এখানে কোনো উঁচু ভবন থাকবে না এবং সব নির্মাণ কাজ হবে স্থানীয় উপকরণ দিয়ে। শহরটি আগামী ২০ বছরে পর্যায়ক্রমে নির্মিত হবে এবং কোনো দূষণকারী শিল্পের অনুমতি থাকবে না। রাজা মনে করেন, গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটির সফলতা ভুটানের ভবিষ্যৎ গঠন করবে। প্রকল্পটি প্রমাণ করবে, ভুটান সাংস্কৃতিক-পরিবেশগত মূল্যবোধকে বজায় রেখে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হতে পারে।
রাজা গত মাসে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করেন এবং ২০ হাজারের বেশি প্রবাসী ভুটানির সামনে গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি এবং ভুটানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার লক্ষ্য, একদিন তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা। প্রধানমন্ত্রী তোবগে বলেন, ‘যখন আমরা বলি আমরা গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেসের নীতিগুলো অনুসরণ করি, তার মানে এ নয় যে আমরা কমে খুশি। আমরাও ধনী হতে চাই, প্রযুক্তিগতভাবেও উচ্চমানের হতে চাই।আমরা চাই, ভুটানিরা মাল্টি মিলিয়ন ডলার কোম্পানির, বহুজাতিক কোম্পানির নেতৃত্ব দিক।’


