২০১৯ সালের কথা। পুলওয়ামায় আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপর সন্ত্রাসী হামলার পর, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিকে বলেছিলেন, ‘‘রক্ত এবং জল একসঙ্গে প্রবাহিত হতে পারে না।’’ কিন্তু সেই সময়ে ভারত শেষ পর্যন্ত সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত না করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এবার পহেলগাঁও হামলার পরে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হল। অনেকেই বলছেন যে এই পদক্ষেপের সূত্রে শুরু হল দুই দেশের পানি যুদ্ধ। এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘ নদী সিন্ধু এবং তার পাঁচ উপনদ বিতস্তা (ঝিলম), চন্দ্রভাগা (চেনাব), ইরাবতী (রবি), বিপাশা (বিয়াস), শতদ্রু (সতলুজ) ভারত থেকে পাকিস্তানের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এ নদগুলোর পানি ন্যায্যতার সঙ্গে ভাগাভাগি করর লক্ষ্যে ‘ইন্ডাস ওয়াটার ট্রিটি’ বা সিন্ধু জল চুক্তি ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়।
চুক্তিটি বাস্তবায়নে উভয় দেশ থেকে একজন করে কমিশনার নিয়ে গঠিত হয় স্থায়ী সিন্ধু কমিশন। চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী কমিশন নিয়মিত ভ্রমণ ও তথ্য আদান-প্রদান এবং বছরে অন্তত একটি সভা করে থাকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কমিশন মোট ১১৭টি সভা করেছে। এছাড়া চুক্তি সম্পর্কিত যেসব মতবিরোধ দেখা দিয়েছে তা চুক্তিতে উল্লেখিত উপায়ে ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। এই চুক্তি পৃথিবীর একমাত্র আন্তসীমান্ত পানি চুক্তি যা নদীর পানি ভাগ না করে নদীগুলোই নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী পূর্ব দিকের সুটলুজ, বিয়াস, রবি নদীর বেশিরভাগ পানি বাধাহীনভাবে ব্যবহার করতে পারবে ভারত। পশ্চিম দিকের সিন্ধু, চেনাব, ঝিলামের পানির অধিকাংশ পাবে পাকিস্তান।
চুক্তিতে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির ওপর জলবিদ্যুৎ বা বিভিন্ন প্রকল্প বানানোর অধিকার ভারতের রয়েছে। সেই প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানানোর অধিকারও চুক্তি দিয়েছে পাকিস্তানকে। চুক্তিটি উভয় দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনওভাবেই যুক্ত নয়। তবে, পূর্ব এবং পশ্চিম উভয় নদীর দিক থেকেই ভাটির দেশ হওয়ায় পাকিস্তান আশঙ্কা করে যে ভারত যে কোনও সময়ে বন্যা বা খরার সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে। ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের কিষেণগঙ্গা ও রাতলে নামে দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত নদীর পানিপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সিন্ধু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে, ২০১৬ সালে এমন অভিযোগ তোলে পাকিস্তান।এই সব নদী থেকেই পাকিস্তানের কৃষিক্ষেত্রে শতকরা ৮০ ভাগ সেচের জল সরবরাহ করা হয়।
সিন্ধু চুক্তি অনুসারে পশ্চিমের নদীগুলো ভারতকে বিশেষ কয়েকটি উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যেমন, ছোট মাপের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, যাতে জল আটকে রাখার প্রয়োজন হয়ই না বা খুব কম হয়, সেগুলো বানাতে কোনও অসুবিধা নেই। পাকিস্তান মনে করে, এই দুটি প্রকল্পে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ভারত যেভাবে ড্যাম বা জলাধারের নকশা প্রস্তুত করেছে তাতে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে। ইসলামাবাদ পশ্চিমের নদীগুলোয় ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে বারবার আপত্তি তুলেছিল। বিষয়টি তারা হেগ-ভিত্তিক স্থায়ী সালিসি আদালতে নিয়ে যায়। ভারত এই বিরোধের বিষয়ে হেগের সালিসি আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করেছে। এই বিরোধের প্রেক্ষিতে ভারত ২০২৩ সালে সিন্ধু চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের জন্য পাকিস্তানকে চিঠি দেয়।
চুক্তির আওতায় থাকা মোট পানির প্রায় ৩০ শতাংশে পায় ভারত। নদীর পানি ব্যবহারের এই অনুপাত ভারতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ভারত এখন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন ও চুক্তির অন্য প্রভাবগুলোর সাপেক্ষে চুক্তির শর্তগুলো নতুন করে বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করে ভারত। সিন্ধু, ঝিলাম, চেনাব এই তিনটি নদী ভারত-প্রশাসিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-প্রশাসিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই ভারত সিন্ধু চুক্তির পুনর্মূল্যায়ণ শুরু করে। হামলার পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, নয়াদিল্লি সিন্ধু উপত্যকার উজানে থাকার সুবিধাটি পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাবে।
এবার ভারত এই জলধারাকে হাতিয়ার করে চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের ভাষ্য-পাকিস্তান যদি সীমান্ত সন্ত্রাস বন্ধ করে এবং অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনে তবে চুক্তি আবার আগের মতোই চলবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্যই ভারত পানি বণ্টন ইস্যুটিকে ব্যবহার করতে চাইছে। তাদের ধারণা — পর্যাপ্ত পানি নিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কিষেণগঙ্গা বাঁধ ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বাঁধের উচ্চতা বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারে ভারত।
দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছে তিনবার, একবারও সিন্ধু পানি চুক্তি ব্যাহত হয়নি। আন্তর্জাতিক চুক্তির অবমাননার করে ন্যায্য পানির হিস্যা বন্ধ করে প্রতিবেশী দেশের জনসাধারণকে শাস্তি দিতে ভারত চায়নি, কিন্তু এবার করল। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে সম্ভবত বোঝাতে চাইছে, দশকের পর দশক ধরে সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে তারা কতটা বিরক্ত, ব্যতিব্যস্ত ও রক্তাক্ত।


