বহু শতাব্দী ধরে আলকেমির স্বপ্ন ছিল সীসা থেকে সোনা তৈরি করা। প্রাচীন চিন, গ্রিস, মিশর ও ইউরোপের গোপন গবেষণাগারে আলকেমিস্টরা খুঁজেছেন সেই জাদুকরী উপায়, যেটি সীসার মতো একটি সস্তা ধাতুকে মহামূল্যবান সোনায় পরিণত করবে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোয় সেই ধারণা বহু আগেই পেছনে পড়ে গিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, আজকের পারমাণবিক গবেষণায় আমরা দেখছি সেই স্বপ্ন যা একদা অসম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে!
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় পার্টিকেল এক্সিলারেটর Large Hadron Collider (LHC)-এর একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ALICE (A Large Ion Collider Experiment) সম্প্রতি এমনই এক বিরল সাফল্য দেখিয়েছে। গবেষকরা দাবি করেছেন, তারা একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সীসা পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন বিচ্ছিন্ন করে সাময়িকভাবে সোনা পরমাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ক্ষণস্থায়ী হলেও এর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বিশাল।
এই ঘটনাটি ঘটেছে Electromagnetic Dissociation নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। যখন দুটি ভারী ধাতব পরমাণু—যেমন সীসা (Lead) নিউক্লিয়াস—LHC-তে উচ্চ গতিতে একে অপরের খুব কাছ দিয়ে ছুটে যায় কিন্তু সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়েও খুবই ঘনিষ্ঠভাবে “near-miss” ঘটায়, তখন এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।
এই ঘনিষ্ঠ অতিক্রমণের সময়, উভয় পরমাণুর চারপাশে গঠিত শক্তিশালী ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড একে অপরের উপর প্রভাব ফেলে। এই ক্ষেত্রের প্রভাবে একটি পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে কয়েকটি প্রোটন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। ALICE-এর গবেষণায় দেখা যায় এই near-miss সংঘর্ষে সীসা নিউক্লিয়াস থেকে ৩টি প্রোটন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সীসার পরমাণু সংখ্যাই যেখানে ৮২, সেখান থেকে ৩টি বাদ দিলে দাঁড়ায় ৭৯—যেটি হল সোনার পরমাণু সংখ্যা। অর্থাৎ সাময়িকভাবে সীসা রূপ নেয় সোনায়।
এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া সোনা অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণে, মাত্র ২৯ পিকোগ্রাম (picogram)—যা ১ গ্রাম-এর এক লাখ কোটি ভাগের এক ভাগ। এবং এই সোনার অস্তিত্বও থাকে মাত্র এক ক্ষণকাল। এটি তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে পড়ে বা অন্য নিউক্লিয়ায় পরিণত হয়। অর্থাৎ এটি স্থায়ী বা ব্যবহারযোগ্য কোনো সোনা নয়। তবে এই “সোনা” তৈরি হয়েছে এমনভাবে যা পূর্ববর্তী পারমাণবিক মডেল ও থিওরিকে সমর্থন করে। এই বাস্তবায়ন হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে অনুমান করা একটি তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার প্রথম পরীক্ষামূলক সফলতা।
এই আবিষ্কারে ALICE ডিটেক্টরের একটি গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র Zero Degree Calorimeter (ZDC) ভূমিকা রেখেছে। এই ডিভাইসটি সংঘর্ষের নির্দিষ্ট কণার ট্র্যাকিং ও শক্তি পরিমাপ করে। ZDC-এর সহায়তায় গবেষকরা নিশ্চিত হন যে, যে নিউক্লিয়াসটি সোনা হওয়ার দাবি করছে, তা আসলেই ৩টি প্রোটন হারিয়েছে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক নিউট্রন বহন করছে। এছাড়াও এই পরিমাপ গবেষকদের হাতে এনে দেয় একটি নতুন নিউক্লিয়ার ম্যাপিং প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে অন্যান্য মৌলকেও এইভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
আধুনিক আলকেমি না কি পারমাণবিক ভবিষ্যৎ?
এই রূপান্তরকে অনেকে আধুনিক যুগের আলকেমির বৈজ্ঞানিক প্রতিফলন বলছেন। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে কোনো রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া নেই, নেই কোনো জাদু। রয়েছে কেবলমাত্র পারমাণবিক শক্তি, কণার interaction এবং কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়নামিক্সের ফলাফল। তবে প্রশ্ন থাকে এটা কি সোনা বানানোর ব্যবহারিক পথ? না। কারণ এই পদ্ধতিতে একটি পিকোগ্রাম সোনা তৈরি করতে প্রয়োজন হয় বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের শক্তি ও প্রযুক্তি। একে তাই “ইকোনমিকালি ইনভায়েবল” বলে ধরা হয়।
কিন্তু এর আসল গুরুত্ব রয়েছে তত্ত্বগত পদার্থবিদ্যার (Theoretical Nuclear Physics) দিক থেকে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিউক্লিয়াসের গঠন, কণার আন্তঃক্রিয়া, ভারী মৌলের স্ট্রাকচার ইত্যাদি বিষয়ে আরও গভীর ধারণা পাচ্ছেন। এই গবেষণা LHC-এর Run 2-এর সময়কালীন পর্যবেক্ষণ।বর্তমানে ALICE-এর উন্নত সংস্করণ Run 3 শুরু হয়েছে, যেখানে luminosity (collision frequency) আরও অনেকগুণ বেশি। এর ফলে আরও বেশি ঘটবে এই near-miss collision এবং গবেষকরা এই ধরণের পারমাণবিক রূপান্তর আরও ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন। এছাড়াও গবেষকরা এখন নজর দিচ্ছেন নতুন মৌলের সৃষ্টি বা নিউট্রন-রিচ আইসোটোপ-এর পর্যালোচনায়, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসা, শক্তি ও মহাকাশ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যেখানে একসময় সীসা থেকে সোনা তৈরি ছিল কেবল রূপকথা, আজ তা ক্ষণিকের জন্য হলেও বাস্তবে সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞান আবারও দেখিয়ে দিল অনেক পুরোনো কল্পনাও একদিন বাস্তব হতে পারে, যদি অনুসন্ধান জারি থাকে। এই আবিষ্কার যেমন পারমাণবিক পদার্থবিদ্যায় নতুন দ্বার উন্মোচন করছে, তেমনি প্রশ্ন তোলে মানব কল্পনার পরিধি ও বিজ্ঞানের সম্ভাব্য পরিসরের সীমা কোথায়?


