সাবমেরিন কেবল – গোপন নজরদারির হাতিয়ার নাকি ষড়যন্ত্রের ফাঁদ ?

সাবমেরিন কেবল আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের ৯৫ শতাংশ ডেটা আদান-প্রদান হয় এই কেবলগুলোর মাধ্যমে। কিন্তু একদিকে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির এই অগ্রগতি, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় গোপন এজেন্ডা এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয়েছে কিছু অদ্ভুত কিন্তু সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রমূলক থিওরি। অনেক গবেষক এবং প্রযুক্তিবিদ মনে করেন, সাবমেরিন কেবল কেবলমাত্র যোগাযোগের জন্যই ব্যবহৃত হয় না বরং এটি গ্লোবাল নজরদারিরও একটি বড় মাধ্যম। ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেন ফাঁস করেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের NSA এবং যুক্তরাজ্যের GCHQ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ট্রাফিক গোপনে পর্যবেক্ষণ করে। তারা বিভিন্ন দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনা সাজায়।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, এবং জার্মানির মতো দেশগুলোর গোপন সংস্থাগুলো নাকি সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিন কেবলে বিশেষ ডিভাইস সংযুক্ত করে, যা সমস্ত ডেটা কপি করে সংরক্ষণ করে। যদিও এসব অভিযোগের প্রমাণ সীমিত, তবে প্রযুক্তিবিদদের মতে এটি অসম্ভব নয়। এ নিয়ে আরেকটি বড় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলছে, কিছু নির্দিষ্ট শক্তিধর দেশ বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের জন্য সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করে। পৃথিবীর বেশিরভাগ সাবমেরিন কেবল পরিচালিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা মিত্রদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। যদি কখনও তারা চায়, তাহলে সহজেই নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারে।

২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউক্রেনের ইন্টারনেট আংশিকভাবে ব্যাহত হয়, যা এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে আরও শক্তিশালী করে। পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সাবমেরিন কেবল নষ্ট করতে পারে যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময়ে সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৮ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় বেশ কয়েকটি সাবমেরিন কেবল একসঙ্গে নষ্ট হয়ে যায়, যার ফলে ইন্টারনেট সেবায় বিশাল সংকট দেখা দেয়। একে সাধারণ দুর্ঘটনা বলা হলেও অনেকে মনে করেন এটি পরিকল্পিত একটি সাইবার যুদ্ধের অংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামরিক বাহিনীগুলো জানে কিভাবে সাবমেরিন কেবল নষ্ট করলে শত্রুপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবে।চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য বড় শক্তিধর দেশগুলোর নৌবাহিনী নাকি এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যাতে যুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিপক্ষকে বিচ্ছিন্ন করা যায়। সাবমেরিন কেবল বসানোর সময় অনেক দেশ নাকি গোপন সামরিক ডিভাইস স্থাপন করে, যা শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে সহায়তা করে। বিশেষ করে দক্ষিণ চীন সাগরের কনফ্লিক্ট এলাকায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা সাবমেরিন কেবল মেরামতের নামে গুপ্ত নজরদারি ডিভাইস বসিয়েছে।

একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুসারে, রাশিয়া নাকি তাদের বিশেষ সাবমেরিন ইউনিট ব্যবহার করে আমেরিকার সাবমেরিন কেবলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার গোপন কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে। নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার (NWO) নামক ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অনুসারীরা বিশ্বাস করেন, কিছু নির্দিষ্ট শক্তিশালী ব্যক্তি ও সংস্থা বিশ্বব্যাপী তথ্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সাবমেরিন কেবল ব্যবহার করে। এটি করা হয় মানুষের ওপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তারের জন্য, যাতে তারা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ধরণের তথ্য পায় এবং বাস্তবতা সম্পর্কে বিকৃত ধারণা গড়ে ওঠে। এই তত্ত্বের অনুসারীদের মতে, যদি গ্লোবাল সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে পৃথিবীর মানুষের ওপর একটি নির্দিষ্ট ধরণের চিন্তাধারা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।

একটি কম প্রচলিত কিন্তু আকর্ষণীয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হলো, সাবমেরিন কেবল বসানোর ফলে সমুদ্রের তলদেশে পরিবর্তন ঘটে, যা ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে। ২০১১ সালের জাপানের ভূমিকম্প এবং সুনামির পর কিছু গবেষক দাবি করেছিলেন যে ভূমিকম্পটি হয়তো সাবমেরিন কেবল বসানোর কারণে হয়েছে। যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এর কোনো প্রমাণ নেই, তবে ষড়যন্ত্র তত্ত্বকারীরা বিশ্বাস করেন যে এটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এমন অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থাকলেও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো আসলেই কি এই প্রযুক্তিকে গোপন নজরদারি বা সাইবার যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে? নাকি এটি নিছকই কল্পনা? উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে।






LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন