সাইকেডেলিক সংস্কৃতির গোপন পক্ষপাত

সাইকেডেলিক শব্দটা শুনলেই আমাদের মনে আসে রঙিন আলো, চেতনার বিকৃতি আর বাস্তবতার সীমানা ভেঙে ফেলার এক অভিজ্ঞতা।কিন্তু এই রহস্যময় জগতের জানালা যখন খুলে যায়, দেখা যায়-তার পাশ দাঁড়িয়ে আছে মূলত এক শ্রেণির মানুষই: পুরুষ, শ্বেতাঙ্গ এবং কলেজশিক্ষিত।

এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক সাইকেডেলিক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই ঠিক এই পরিচয়ের মধ্যেই পড়েন। এমনটি নতুন কিছু নয়। ১৯৬০-এর দশকের সাইকেডেলিক বিপ্লব থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত-অ্যালডাস হাক্সলি, টিমোথি লিয়ারি, টেরেন্স ম্যাককেনা কিংবা হ্যামিল্টন মরিস-সবাই ছিলেন পুরুষ, সাদা, এবং শিক্ষিত। প্রশ্নটা উঠেই যায়, এই অভিজ্ঞতা যদি আত্মার মুক্তি দেয়, চেতনার অন্তর্গত সত্য উন্মোচন করে, তবে তা এত সীমিত গোষ্ঠীর ভেতরেই কেন আটকে আছে?

এই একচেটিয়া অবস্থান শুধু সামাজিক বৈষম্যের ফল নয়, বরং সাইকেডেলিক গবেষণার ইতিহাসেই রয়েছে লিঙ্গ ও জাতিগত পক্ষপাতের ছাপ। ষাটের দশকের গবেষকরা যেমন সমকামিতাকে “চিকিৎসাযোগ্য অসুস্থতা” হিসেবে LSD দিয়ে ‘সারাতে’ চেয়েছিলেন, তেমনই প্রাথমিক গবেষণাগুলো পুরুষদের “বীরত্বপূর্ণ আত্ম-পরীক্ষা” হিসেবে উপস্থাপন করেছে, যেখানে নারীর জন্য ছিল লজ্জা, ভয় এবং সামাজিক জটিলতা।

১৮শ শতকের শেষ দিকে নাইট্রাস অক্সাইড নিয়ে ব্রিটিশ গবেষকরা যখন প্রথম পরীক্ষায় নামেন, তখন এক নারী অংশগ্রহণকারী গ্যাস নেওয়ার পর অস্থির হয়ে রাস্তায় দৌড়ে যান, আর তারপর অন্য নারীরা ভয় পেয়ে সরে দাঁড়ান। সেই একই গ্যাস নিয়ে গবেষক হাম্পি ডেভি
যখন চিৎকার করে বলেন, “চিন্তা ছাড়া কিছুই নেই!”, তখন সেটি তাকে এনে দেয় খ্যাতি, পুরস্কার, আর বিজ্ঞান সমাজে জায়গা। এই দ্বৈত মানদণ্ড শুধু ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ভাষাতেও ছড়িয়ে আছে। সাইকেডেলিক ট্রিপ রিপোের্ট, অর্থাৎ ড্রাগ নেওয়ার পরকার অভিজ্ঞতার বিবরণ একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে বাঁধা। সময়, রঙ, দৃশ্য, শব্দ-সবকিছুকে সংক্ষিপ্ত বৈজ্ঞানিক ভাষায় প্রকাশ করা হয়। এটি মূলত এক পুরুষতান্ত্রিক, মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে অভিজ্ঞতা মানেই ‘ডেটা’।

এই কাঠামোতে নারী কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত। ১৯১৪ সালে ম্যাবেল ডজ লুহান নামের এক নিউ ইয়র্কের সমাজসেবী পিয়োটে গ্রহণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন তার স্মৃতিকথায়। সেখানে তিনি শুধু দৃশ্য-শব্দ নয় বরং সামাজিক সম্পর্ক, শক্তির খেলা, নিয়ন্ত্রণ আর বিদ্রোহ এই সমস্ত কিছু তুলে ধরেন। তার ভাষা ছিল প্রাণবন্ত, জটিল, আর সামাজিকভাবে জড়িত। অথচ এই ধরনের বয়ানকে ‘বৈজ্ঞানিক’ ধরা হয়নি। পরবর্তী শতাব্দীতেও নারী গবেষকদের সাইকেডেলিক অভিজ্ঞতা গবেষণার মূলধারায় ঠাঁই পায়নি। LSD-র ব্যবহার নিয়ে আনা’ইস নিন বা লরা হাক্সলির লেখাগুলো চুপিচুপি থেকে গেছে, যখন লিয়ারির ‘চেতনার বিপ্লব’ হয়ে উঠেছে জনমনে চিরস্থায়ী।

তবে সময় বদলাচ্ছে। আজকের সাইকেডেলিক সংস্কৃতিতে নতুন কণ্ঠস্বর উঠে আসছে-নারী, আদিবাসী, LGBTQ+ সম্প্রদায়ের মানুষ, এবং অশ্বেতাঙ্গ ব্যবহারকারীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, গবেষণার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করছেন। লন্ডনের ‘Breaking Convention’ বা সান ফ্রান্সিসকোর ‘Queering Psychedelics’ এর মতো সম্মেলনে এখন এসব কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।চক্রুনা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা বিয়া লাবাতে যেমন বলছেন, ‘আমরা চাই জ্ঞানের উপনিবেশভিত্তিক কাঠামো ভেঙে দিতে, যেখানে সাদা, সোজা, চিকিৎসক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনও আধিপত্য করছে।’

আসলে চেতনার এই জানালা খোলা থাকে তাদের জন্যই, যাদের হাতে থাকে সময়, নিরাপদ সামাজিক অবস্থান, আইনি সুরক্ষা, আর অর্থনৈতিক স্থিতি-যা এখনও বিশ্বব্যাপী অনিয়মিতভাবে বিতরণ হয়েছে। সেই কারণে আজও সাইকেডেলিক সংস্কৃতিতে সাদা, কলেজ-শিক্ষিত পুরুষের আধিপত্য স্পষ্ট। যদি একদিন এই সুযোগগুলো সমানভাবে ছড়িয়ে যায়, তাহলে হয়তো দেখা যাবে-চেতনার অজানা রাজ্যে প্রবেশ করছে সেই সমস্ত মানুষ, যারা বরাবর সমাজের প্রান্তে থেকেছে। যারা প্রতিদিনই বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়।সাইকেডেলিক যদি সত্যিই হয় ‘আত্মার দর্পণ’, তবে তার আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া উচিত সব চেহারা-সব পরিচয়, সব অভিজ্ঞতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন