সরকারি তালিকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নদীরা

বাংলাদেশে প্রবহমান নদ-নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক চলছেই। সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ১ হাজার ১৫৬টি নদ-নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। আগামী ১৪ এপ্রিল চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। তবে এ তালিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই আপত্তি তুলেছেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তালিকা থেকে বাংলাদেশ নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভুক্ত ২০০টি নদী বাদ পড়েছে। আবার নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে ১৪৮টি নদীর নাম। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৮টি নদীর নামও বাদ গেছে।

বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করছেন নদীর তালিকা নির্ধারণে গ্রহণযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির পরিবর্তে শুধুমাত্র কাগজ-কলমের কাজের (টেবিল ওয়ার্ক) উপর নির্ভর করা হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তালিকার মধ্যেও অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ১ হাজার ৮টি নদীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। সেসময় এটি ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে। এমনকি নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ও সেই তালিকাকে আমলে নেয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন করে তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।

নদী ও প্রকৃতি গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে জেলা প্রশাসন নদী নির্ধারণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রেই ভুল করছে। কিছু ছোট নদী যেগুলো খালের চেয়ে বড় এবং স্থানীয়ভাবে ‘খাড়ি’ নামে পরিচিত, সেগুলো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না। অন্যদিকে কিছু নদী যেগুলো বছরের বেশির ভাগ সময় শুকিয়ে থাকে সেগুলোও তালিকায় রাখা হচ্ছে না। ফলে প্রকৃত নদীর সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছে না। মাহবুব সিদ্দিকী ৩০ বছর ধরে সরজমিনে গবেষণা করে ১ হাজার ৯০৮টি নদী চিহ্নিত করেছেন। তার মতে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলার নদীগুলো সঠিকভাবে জরিপ করা হলে এই সংখ্যা ২ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। ২০১১ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক ছয় খণ্ডের একটি বই প্রকাশ করেছিল যেখানে ৪০৫টি নদীর বর্ণনা ছিল। কিন্তু বর্তমান তালিকা থেকে সেই ৪০৫টির মধ্যেও ১৮টি নদীর নাম বাদ পড়েছে।

গাজীপুরের নদী নির্ধারণ কমিটির সদস্য মো. মনির হোসেন স্বীকার করেছেন নদীর সংখ্যা নির্ধারণে টেবিল ওয়ার্কের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়েছে। জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাগজ-কলম নিয়ে বসে ঠিক করে ফেলেন কোন নদীর নাম থাকবে কোনটি বাদ যাবে। মনির হোসেন বলেন, ‘নদীর সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত করতে হবে, প্রবীণদের মতামত নিতে হবে এবং নদীর উৎস ও পতিত মুখ সরজমিনে দেখতে হবে। তা না হলে আগের মতোই তালিকা বিতর্কিত হয়ে যাবে।’

রংপুর বিভাগের নদীর তালিকা প্রণয়নে সরকারি ও বেসরকারি তথ্যের সমন্বয় করা হয়েছে। এখানে জেলা পর্যায়ের প্রকৌশলীরা সরাসরি নদী পরিদর্শন করেছেন। রংপুর বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির সভায় আট জেলার নদীর সংখ্যা চূড়ান্ত করা হয়। তালিকা অনুযায়ী রংপুরে ৪০টি, নীলফামারীতে ৩৭টি, লালমনিরহাটে ১৮টি, কুড়িগ্রামে ৩৫টি, গাইবান্ধায় ২৪টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ৩৯টি, দিনাজপুরে ৩৪টি ও পঞ্চগড়ে ৫০টি নদীর নাম রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান বলেছেন, ‘আমরা বিভাগীয় কমিশনারদের ২৮ তারিখের মধ্যে চূড়ান্ত তালিকা দিতে বলেছি। এরপর ওয়েবসাইটে তালিকা প্রকাশ করে জনসাধারণের মতামত নেওয়া হবে। ভুল-ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ থাকবে।’

নদ-নদীর সংখ্যা নির্ধারণে বাংলাদেশ এখনও একটি সুনির্দিষ্ট, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত পদ্ধতির অভাবে ভুগছে। কেবলমাত্র টেবিল ওয়ার্কের মাধ্যমে তালিকা তৈরি করলে বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। এজন্য সরজমিনে পরিদর্শন এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় যদি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয় তবে চূড়ান্ত তালিকাও আগের মতোই বিতর্কিত হয়ে থাকবে।


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন