সম্রাট অশোক ভারতীয় ইতিহাসের এক শক্তিশালী ও রূপান্তরমূলক নাম। কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তিনি। দয়ার রাষ্ট্রনীতি, অহিংসার দর্শন এবং মানবিক শাসনব্যবস্থার এক নতুন ধারা চালু করেন। কিন্তু ইতিহাসের পাতার নিচে এমন একটি ছায়া অধ্যায় রয়ে গেছে, যা কখনো নথিবদ্ধ হয়নি অথচ সময়ের গহীনে আজও দোলা দেয়। সেটি হলো “Nine Unknown Men”—সম্রাট অশোকের গোপন সংঘ, যাদেরকে মানবজাতির সবচেয়ে বিপজ্জনক ও প্রভাবশালী জ্ঞানের রক্ষক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
“নয়টি অজানা পুরুষ” ধারণার প্রচলন প্রথম হয় ১৯২৩ সালে Talbot Mundy নামক এক ব্রিটিশ রোমাঞ্চলেখকের বইয়ে। তাঁর উপন্যাস The Nine Unknown দাবি করে, খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতাব্দীতে অশোক একটি গোপন সংঘ গঠন করেছিলেন যারা নয়টি বিষয়ভিত্তিক গোপন বই রক্ষা করত। উদ্দেশ্য ছিল একটাই এমন জ্ঞান জনসাধারণের নাগালের বাইরে রাখা, যা ব্যবহৃত হলে মানবজাতির ধ্বংস অনিবার্য। এই কাহিনিকে পরবর্তীতে বিভিন্ন ওকল্ট থিওরিস্ট, কন্সপিরেসি রিসার্চার ও fringe-historians উপাত্ত হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন। যদিও মূলধারার ইতিহাসবিদেরা একে “কাল্পনিক সম্ভাবনার সাহিত্যিক ব্যাখ্যা” বলেই বিবেচনা করেন।
কি ছিল সেই ভয়ংকর বিজ্ঞান? এই গোষ্ঠীর প্রতিটি সদস্য ছিল একেকটি বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ এবং একটি করে গোপন গ্রন্থ রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। দাবিগুলোর ভিত্তিতে এসব গ্রন্থে যে বিষয়বস্তু ছিল বলে অনুমান করা হয় তা হলো:
প্রোপাগান্ডা ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধবিদ্যা
মানব শরীরের ভিতরকার ঘাতক পদ্ধতি ও আত্মনাশের গোপন বিজ্ঞান
জীববিজ্ঞান ও প্রাণ পুনরুজ্জীবনের রীতি
জড়শক্তি ও তার নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (possibly free energy বা advanced energy harnessing)
মাধ্যাকর্ষণ (Gravity) ও আন্তঃনাক্ষত্রিক ভ্রমণ প্রযুক্তি
যোগচর্চা ও মানবসত্তার অতীতজ্ঞান
আলোক ও শব্দ তরঙ্গে যুদ্ধ ও চিকিৎসা (sound-light weapon systems?)
রাসায়নিক রূপান্তর ও পদার্থ পরিবর্তনের প্রাচীন সূত্র (alchemy)
সমাজ ও জনতাকে নিয়ন্ত্রণের গাণিতিক মডেল (modern statistics এর প্রাচীন সংস্করণ)
এই ধারণাগুলো অদ্ভুত ও আধুনিক, অনেকাংশে ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকেও ছাপিয়ে যায়।
সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের পর অহিংসার আদর্শে দীক্ষিত হলেও তিনি রাষ্ট্রচালনায় বাস্তববাদী ছিলেন। গোপন সংরক্ষণযোগ্য জ্ঞান ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এক পুরনো কৌশল। যেমন প্রাচীন মিশর, গ্রীক বা মেসোপটেমিয়ায় ধর্মযাজকরা বৈজ্ঞানিক তথ্য গোপন রাখত। সুতরাং যদি Nine Unknown Men বাস্তবও না হয়, তাদের ধারণাটি এক গভীর সত্যের ছায়া বহন করে জ্ঞান সর্বজনীন নয়, বরং ক্ষমতার উৎস।
বর্তমান সময়ে “Deep State”, “Shadow Government”, “Black Projects”, বা “Breakaway Civilizations” ধারণা অত্যন্ত জনপ্রিয়। কিছু গবেষক মনে করেন, Nine Unknown-এর ধারণা সম্ভবত আধুনিক Illuminati, Freemasons, এমনকি CIA-এর Ultra-Secret Units-এর পূর্বসূরি। আবার কেউ বলেন, এই গোষ্ঠী হয়তো আজও আছে এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মৌন প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
অনেকে মনে করেন, টেসলা, আইনস্টাইন, কিংবা ভারতীয় বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসুর গবেষণার পেছনে কোনো ‘অদৃশ্য উৎস’ কাজ করেছিল। আবার কেউ যুক্ত করেন, জ্ঞান বিজ্ঞানে হঠাৎ আবির্ভূত ‘out-of-place’ তত্ত্বগুলো—যেমন কোয়ান্টাম তত্ত্ব, হিউম্যান ক্লোনিং, বা দিক পরিবর্তনকারী মহাকর্ষ প্রযুক্তি এই গোষ্ঠীর পরোক্ষ ফল হতে পারে।
অশোকের “Nine Unknown Men” নিয়ে প্রামাণ্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি। না তার রক এডিক্টে, না বৌদ্ধ বাণীতে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি একটি সাহিত্যিক রূপক মাত্র। তবে “গোপন সমাজে জ্ঞান রক্ষার সংস্কৃতি” প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে যেমন তন্ত্র, যোগ, এবং নাথপন্থায় বিস্তর পাওয়া যায়। সুতরাং ধারণাটিকে পুরোপুরি বাতিল করাও একপ্রকার গবেষণা-অযোগ্যতা।
Nine Unknown Men এক রহস্যময় কাহিনি, যা ইতিহাস, দর্শন, ও ষড়যন্ত্রতত্ত্বের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা যদি বাস্তব হয়, তাহলে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী গোপন গোষ্ঠী। যদি না হয়, তাহলেও তারা মানবজাতির জ্ঞানের প্রতি এক সতর্ক সংকেত সব জ্ঞান হয়তো জানার নয়।


