২০১২ সালের উইম্বলডন ফাইনালে অ্যান্ডি মারে যখন রজার ফেদেরারের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে শক্তিশালী অবস্থান শুরু করেন, তখন ডেইলি টেলিগ্রাফের কলামিস্ট ম্যাথিউ নরম্যান এই ঘটনাকে ‘ডক্টর হু’র সমান্তরাল মহাবিশ্বের মতো ব্যাখ্যা করেন। এক বছর পর মারে শিরোপা জিতে এই ধারণাটি আরও প্রবল হয়-দুটি টেনিস চ্যাম্পিয়ন একই খেলার ভেতরেও যেন ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় বাস করছেন। এই ‘সমান্তরাল মহাবিশ্ব’ ধারণা শুধু ক্রীড়া সাংবাদিকতার রসদ নয়, বরং বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য জুড়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরা দীর্ঘদিন ধরেই মহাবিশ্বের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ১৯৩৫ সালে এরউইন শ্রডিঙারের বিখ্যাত ‘বিড়াল-পরীক্ষা’ কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তার একটি প্রতীকী রূপ। বিড়ালটি একই সময়ে জীবিত ও মৃত-অর্থাৎ, বাস্তবতা একাধিক সম্ভাবনার সমষ্টি। ১৯৫৭ সালে হিউ এভারেট ‘Many Worlds Interpretation’ প্রস্তাব করেন, যেখানে কোয়ান্টাম পর্যবেক্ষণ একটি মহাবিশ্বকে বিভক্ত করে অসংখ্য বিকল্প মহাবিশ্বে। এই তত্ত্ব অনুসারে, আমাদের প্রত্যেক সিদ্ধান্ত এবং ঘটনা নতুন একটি মহাবিশ্বের জন্ম দেয়, যেখানে ভিন্ন ফলাফল বাস্তবায়িত হয়।
রিচার্ড ফাইনম্যানের ‘Path Integral’ তত্ত্ব আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়, আলো একটি বিন্দু থেকে অন্য বিন্দুতে যাওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব পথ অনুসরণ করে, কিন্তু আমরা শুধুমাত্র সবচেয়ে কার্যকরী পথটিই দেখতে পাই। স্টিফেন হকিং ‘The Universe in a Nutshell’ বইয়ে ‘cosmic casino’ রূপক ব্যবহার করে বলেন, আমাদের দেখা মহাবিশ্বের বাইরে অসংখ্য সম্ভাব্য মহাবিশ্ব রয়েছে, যেখানে প্রতিটি সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়।
প্রাচীন গ্রিক দর্শনে আমাদের আধুনিক ধারণাগুলোর শিকড় অনেক গভীরে। ডেমোক্রিটাসের ‘অণু তত্ত্ব’ অনুসারে, বিশ্ব অসীম পরমাণুর সমষ্টি, যা বিভিন্নভাবে মিলিত হয়ে অসংখ্য সম্ভাব্য জগত তৈরি করে। এপিকিউরাস আরও এগিয়ে গিয়ে ‘swerve’ ধারণা দেন, যা বলে যে পরমাণুগুলো হঠাৎ করেই দিক পরিবর্তন করতে পারে, ফলে ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত নয়, বরং সম্ভাবনার সমাহার।
রোমান দার্শনিক লুক্রেটিয়াস এবং সিসেরো এ ধারণাকে মানব ইতিহাসের প্রসঙ্গে প্রয়োগ করেন। সিসেরো লিখেছেন, “আমাদের মতো অসংখ্য মানুষ একই সময়ে একই বিষয়ে আলোচনা করছে, একই নাম, সম্মান ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে।” এই চিন্তা ইতিহাসকে একরৈখিক নয়, বরং বহুমুখী বিকল্প পথের সমষ্টি হিসেবে দেখে।
বিকল্প ইতিহাস এবং ‘What If?’ প্রশ্নের গুরুত্ব –
ইতিহাসের বিকল্প সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করা প্রাচীন কাল থেকে বিদ্যমান। রোমান ইতিহাসবিদ লাইভি Alexander the Great-এর ইতালিতে আক্রমণ না করার ‘What if?’ প্রশ্ন তোলেন। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক খ্রিস্টীয় ইতিহাসবিদেরা এই প্রশ্ন থেকে দূরে থাকলেও, আধুনিক বিকল্প ইতিহাসের সাহিত্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফিলিপ রথের ‘The Plot Against America’ বা ফিলিপ কে ডিকের ‘The Man in the High Castle’ এই ধারার আধুনিক উদাহরণ।
খ্রিস্টীয় দর্শনে ইতিহাস ঈশ্বরের পরিকল্পনার অধীন, যেখানে সবকিছু পূর্বনির্ধারিত। শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এ যেমন বলা হয়েছে, “There’s a divinity that shapes our ends,” অর্থাৎ মানুষের ইচ্ছার বাইরে একটি উচ্চতর শক্তি ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। এর বিপরীতে, এপিকিউরিয়ান দর্শন মানব ইতিহাসকে দৈবচয়নের ফলাফল হিসেবে দেখায়, যেখানে সম্ভাবনার অসংখ্য পথ খোলা।
১৭শ শতকের গটফ্রিড লাইবনিজ ‘বেস্ট অফ অল পসিবল ওয়ার্ল্ডস’ তত্ত্বে বলেন, ঈশ্বর সব সম্ভাব্য জগতের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম জগত বেছে নিয়েছেন। যদিও এই ধারণা ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তার প্রতি বিশ্বাসকে ধরে রাখে, তবুও এটি বিকল্প বাস্তবতার ধারণাকে দর্শনীয় মাত্রা দেয়।
জর্জ লুইস বোর্হেসের ‘The Library of Babel’ গল্পে অসীম সম্ভাবনার একটি গ্রন্থাগার বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে সমস্ত সম্ভাব্য বই রয়েছে, কিন্তু অর্থপূর্ণ তথ্য পাওয়া কঠিন। এটি মাল্টিভার্সের একটি প্রতীকী রূপ, যেখানে সম্ভাবনার সমষ্টি অবিরাম বিস্তৃত।
আধুনিক চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে মাল্টিভার্স ধারণা ব্যাপক জনপ্রিয়। ‘Sliding Doors’ এবং ‘The Matrix’ এর মতো সিনেমা আমাদের দেখায়, কিভাবে একটিমাত্র মুহূর্তের পরিবর্তন জীবনের সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা সৃষ্টি করতে পারে। এই ধারনা আমাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও ইতিহাসের বহুমুখী সম্ভাবনার প্রতি সচেতন করে তোলে।
মাল্টিভার্সের ভবিষ্যত
বিজ্ঞানীরা যেমন হিউ এভারেট, রিচার্ড ফাইনম্যান ও স্টিফেন হকিং মাল্টিভার্স তত্ত্বকে সমর্থন করেছেন, তেমনি দর্শন ও সাহিত্যও এই ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে। মাল্টিভার্স কেবল একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা, এবং বাস্তবতার প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তোলে।
বর্তমান কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা, মহাবিশ্ববিজ্ঞান ও তথ্যতত্ত্বের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মাল্টিভার্সের ধারণা আরও জটিল ও বিস্তৃত হচ্ছে। গবেষকরা এখন প্রশ্ন করছেন, এই অসংখ্য মহাবিশ্বের মধ্যে আমাদের অবস্থান কী, এবং আমরা কীভাবে এই বিকল্প বাস্তবতাগুলোর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি।
সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধারণা আমাদের চিন্তার জগতকে বিস্তৃত করেছে-বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও ইতিহাসের সীমানা পেরিয়ে। এটি আমাদের শেখায়, বাস্তবতা একক নয়, বরং সম্ভাবনার অসংখ্য পথের সমষ্টি। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রত্যেকটি মুহূর্ত নতুন একটি বিশ্ব সৃষ্টি করে। এই অন্তহীন বিকল্পের মাঝে আমরা নিজেকে খুঁজে পাই-একই সঙ্গে অসীম সম্ভাবনার অংশ, একই সঙ্গে একটি অনন্য বাস্তবতার অধিকারী।
সম্ভবত আমাদের জীবনের প্রতিটি ‘কি হতো যদি’ প্রশ্নের উত্তর অন্য কোনো মহাবিশ্বে অপেক্ষা করছে-যেখানে আমাদের বিকল্প আত্মারা ভিন্ন গল্প বুনছে। এই চিন্তা আমাদের কেবল কৌতূহলী করে না, বরং আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যের সন্ধানে নিয়ে যায়। সমান্তরাল মহাবিশ্বের এই জটিল ও রহস্যময় ধারণা আজকের বিজ্ঞান ও মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।


