আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে গভীর ও দুর্বোধ্য ধাঁধাগুলোর একটি হলো সময়। আমরা প্রতিনিয়ত সময়ের মধ্যে বাস করি, ” কিন্তু সময় আসলে কী” এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞান এখনও দিতে পারেনি। পদার্থবিদ্যা, দর্শন ও চেতনা-বিজ্ঞান মিলেও সময়ের প্রকৃতি পুরোপুরি অনুধাবন করা যায়নি। বিজ্ঞানীরা বহু বছর ধরে ‘প্রথম কারণ’ বা ‘প্রাথমিক অবস্থা’ নামের এমন একটি বিন্দু খুঁজে বেড়াচ্ছেন, যা মহাবিশ্বের সূচনার চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেবে। কিন্তু এখানেই মূল সমস্যা—এই ‘প্রথম কারণ’ নির্ধারণ করতে হলে আমাদের মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা, শক্তিক্ষেত্র, গতি ও অবস্থান সম্পর্কে নিখুঁত জ্ঞান থাকতে হবে। সমস্যা আরও গভীর। আমরা মহাবিশ্বের বাইরের কোনো ধারণাই পাই না। আমরা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নামক ‘বাক্সের’ বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাতে পারি না, কারণ এই বাক্সই সর্বস্ব। এ কারণে ‘প্রথম কারণ’ কেবল অজানাই নয়, এটি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও মৌলিকভাবে দুর্বোধ্য।
পদার্থবিদরা সাধারণত ঘড়ির কাঁটার সময়কেই একমাত্র বাস্তব সময় হিসেবে গণ্য করেন। আমাদের ব্যক্তিগত সময়ানুভূতি—যেমন মুহূর্তের দীর্ঘতা, স্মৃতি, ভবিষ্যতের আশঙ্কা—এসবকে তারা ‘দ্বিতীয় স্তরের’ বা ‘মস্তিষ্কের গঠিত’ বিষয় বলে মনে করেন। ১৯২২ সালে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং দার্শনিক হেনরি বার্গসনের বিখ্যাত বিতর্কও এই দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, “পদার্থবিদের সময়ই একমাত্র সময়”। তবে মৃত্যুর আগে আইনস্টাইন নিজেই এই বিষয়ে অনিশ্চয়তায় ছিলেন, বিজ্ঞানের কাঠামোয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও সময়ানুভূতির স্থান কোথায়? কিন্তু যদি সময়ের শুরু সম্পর্কেই আমাদের প্রশ্নটি ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়?
আমরা প্রায়ই ধরে নিই যে বিজ্ঞান আমাদের মহাবিশ্বের একটি সম্পূর্ণ, নিরপেক্ষ বর্ণনা দেবে, যা আমাদের ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে আলাদা। কিন্তু এই ধারণাটিই গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ। যখন আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে বস্তুগত জ্ঞান অর্জন করি, তখন আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার ‘পেছনের অভিজ্ঞতা’ দেখতে পাই না। আমরা ভুলে যাই যে এই সমস্ত বিজ্ঞান-জ্ঞান আমাদের উপলব্ধির মাধ্যমেই সম্ভব। এখানেই বিজ্ঞানের অন্ধবিন্দু, এমন এক বিন্দু যেখানে বিজ্ঞান নিজেই নিজেকে দেখতে পায় না। এই অন্ধবিন্দুর পেছনে আছে একটি মৌলিক বিশ্বাস, “পদার্থবিজ্ঞান যেভাবে বিশ্বকে বর্ণনা করে, সেটাই চূড়ান্ত বাস্তবতা।” কিন্তু দাবিটি কি টেকসই?
আমরা কখনোই আমাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে কোনো শারীরিক বাস্তবতার সম্মুখীন হই না। মৌলিক কণা, সময়, জিন বা মস্তিষ্ক—সবকিছু আমাদের পরিমাপ, মডেল ও ভাষার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। বিজ্ঞান প্রকৃতিকে ‘যেমন আছে তেমন’ দেখায় না, বরং এটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নির্মিত হয়। যদি আমরা বলি “শারীরিক বাস্তবতা মানেই পদার্থবিদ্যার বর্ণনা”, তবে এটি ভুল; কারণ পদার্থবিদ্যা চেতনার ব্যাখ্যা দেয় না। আর যদি বলি “ভবিষ্যতের পদার্থবিদ্যাই প্রকৃত বাস্তবতা বর্ণনা দেবে”, সেটি অর্থহীন; কারণ আমরা জানি না ভবিষ্যতের বিজ্ঞান কেমন হবে। বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানে। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এমন এক বিশ্ব দেখায় যেখানে কণা ও তরঙ্গ একত্রে বিদ্যমান। গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিমাপের মাধ্যমে আমরা বাস্তবতাকেই প্রভাবিত করি। এখানে ‘পর্যবেক্ষক’-এর ভূমিকা অপরিহার্য।
কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা অনুসারে, ইলেকট্রনের তরঙ্গফাংশন কেবল পরিমাপের সময়ই বাস্তবতা পায়। অন্যদিকে ‘গোপন চলক’ তত্ত্ব (Hidden Variables) পর্যবেক্ষক-স্বাধীন বাস্তবতা বজায় রাখতে চায়, কিন্তু এতে অতিরিক্ত ও অদৃশ্য উপাদান (যেমন সমান্তরাল মহাবিশ্ব) যোগ করতে হয়।কোয়ান্টাম বায়েশিয়ানিজম (QBism), বলে—কোয়ান্টাম অবস্থার সম্ভাব্যতা আসলে বাস্তবতার অংশ নয়; বরং এটি পর্যবেক্ষকের বিশ্বাসের ডিগ্রি। QBism অনুযায়ী, বিজ্ঞান হলো সহভাগী বাস্তবতা—একটি পারস্পরিক ক্রিয়াশীল নেটওয়ার্ক, যেখানে মানুষ ও প্রকৃতি জড়িত। এখানে ‘বাস্তবতা’ আর পর্যবেক্ষক আলাদা নয়। চেতনা-গবেষণাতেও এই অন্ধবিন্দু প্রকট। আমরা জানি না কেন কোনো শারীরিক ব্যবস্থার ‘আমি’ বলে একটি অভিজ্ঞতা জন্মায়। বিজ্ঞান আজও চেতনা ও স্ব-সচেতনতার কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কখনোই আমাদের অভিজ্ঞতার বাইরে নিয়ে যায় না। বিজ্ঞান হলো পরিশীলিত মানবিক প্রচেষ্টা, যা পর্যবেক্ষণ, গণিত ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। গ্যালিলিওর ঘর্ষণহীন তল কিংবা বোরের পরমাণু মডেল—এসব প্রকৃতিতে নেই, এগুলো আমাদের মানসিক নির্মাণ। পদার্থবিদদের সময় আমাদের জীবনের সময়ানুভূতির ওপর নির্ভরশীল। মহাবিশ্বের কোনো সম্পূর্ণ বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়; বরং এটি একটি চলমান, স্ব-সংশোধনশীল আখ্যান। সময় এই আখ্যানের কাঠামো দেয়, কিন্তু এর অর্থ আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই আসে।
অন্ধবিন্দুকে চিনতে পারা মানে এই বিভ্রম থেকে জাগরণ যে বিজ্ঞান আমাদের পরম জ্ঞান দিতে পারে। বিজ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একে অপরের সাথে জড়িত। আমরা যদি প্রকৃতিকে কেবল বাইরের বস্তু হিসেবে দেখি, তাহলে এর গভীরতম রহস্যগুলোর সমাধান করতে পারব না। আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতি, যেখানে আমরা নিজেদেরকে প্রকৃতির অভিব্যক্তি ও প্রকৃতির আত্ম-বোঝাপড়ার উৎস হিসেবে দেখব। শুধু তখনই সময়, চেতনা ও বাস্তবতার প্রকৃত রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।


