পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সায়েদা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, “টেকসই উন্নয়ন” শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও এর প্রকৃত সংজ্ঞা ও মানদণ্ড প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে, যার ফলে গ্রীনওয়াশিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয় যা ন্যায়বিচার ও সমতা নিশ্চিত না করে বরং বিভ্রান্তি ছড়ায়।
আজ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আয়োজিত “বাংলাদেশ জাস্ট ট্রানজিশন অ্যাকাডেমি: একটি সবুজ অর্থনীতিতে সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ” শীর্ষক সেশনে তিনি এ কথা বলেন।
রিজওয়ানা হাসান বলেন, “বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন আমাদের অনুসৃত মানদণ্ডও যুগোপযোগী হতে হবে। শুধু জ্বালানি খাতেই নয়, প্রত্যেকটি খাত বস্ত্র, কৃষি, উৎপাদন—সব ক্ষেত্রেই সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও মানদণ্ড থাকা উচিত, যাতে দেশ এককভাবে নয়, সমগ্র জাতি একসাথে এগিয়ে যেতে পারে।”
তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, বেসরকারি খাত বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাপে টেকসই পথে যাত্রা শুরু করলেও, এটি এখনও খণ্ডিত এবং আনুষ্ঠানিক নয়। “আমরা এখনো সম্মিলিতভাবে নির্ধারণ করতে পারিনি কী গ্রহণ করবো, আর কী প্রত্যাখ্যান করবো।”
পরিবেশ আন্দোলনে নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। “যখন আমরা পোড়া ইট শিল্পকে চ্যালেঞ্জ করি, তখন জিগজ্যাগ কিলনকে টেকসই সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ সেগুলোও বায়ু দূষণ করে, কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নেয় এবং পাহাড় কেটে পরিবেশ নষ্ট করে। চিমনির উচ্চতা বাড়ানো হয় আরেকটি সমাধান হিসেবে, যা কেবল অস্থায়ী প্যাঁচাল মাত্র।”
তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ৩২টি দেশ পোড়া ইট পুরোপুরি বন্ধ করেছে। “বাংলাদেশকেও বায়ু, মাটি ও শ্রমশক্তিকে সুরক্ষা দেয়—এমন পূর্ণ বিকল্পে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।”
রিজওয়ানা হাসান খাতভিত্তিক সমস্যাগুলোকে পাশ কাটানোর প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন, “শ্রম শোষণ থেকে শুরু করে পানির অপচয় পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই সমাধান আসে বেসরকারি খাত থেকে, কিন্তু সেগুলো বৃহত্তর পরিসরে ছড়ায় না। আমাদের কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।”
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ও একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জাতীয় প্রচেষ্টায় দিকনির্দেশনা দিতে এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে পরিবেশগত মূল্যবোধ তাদের মূল দায়িত্বে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।
“পরিবেশ অধিদপ্তরের (ডিওই) কাজকে অনেকেই প্রকল্প অনুমোদনের দপ্তর বলে ধরে নেয়। যখন আমরা পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় কোনো প্রকল্পে ‘না’ বলি, তখন আমাদের উন্নয়নের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলাতে হবে,” বলেন তিনি।
রিজওয়ানা হাসান জোর দিয়ে বলেন স্থানীয় সরকার, পরিবহন, জ্বালানিসহ সব দপ্তরকে টেকসই উন্নয়নের প্রতি ঐক্যবদ্ধ প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। “ভবনের সবুজ সার্টিফিকেশন অর্থহীন যদি আমরা লিঙ্গ সংবেদনশীলতা, শ্রমিক কল্যাণ, পানি পুনর্ব্যবহার ও শক্তি দক্ষতা উপেক্ষা করি। এখনও সকাল ১০টাও হয়নি, অথচ এই কক্ষে প্রচুর কৃত্রিম আলো জ্বলছে। যথাযথ নকশা থাকলে এটি দরকার হতো না।”
তিনি বলেন, “আমরা সরকারকে লোডশেডিং বন্ধের চাপ দিই, অথচ আমরাই আমদানিকৃত শক্তি অপচয় করি। এটি শুধু নীতির বিষয় নয়—এটি মূল্যবোধ আভ্যন্তরীণ করার প্রশ্ন।”
শেষে রিজওয়ানা হাসান আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা, সরকার, বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজ একযোগে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং জাতীয় নীতিনির্ধারণে দীর্ঘস্থায়ী টেকসই চর্চা নিশ্চিত করবে। “এটি শুধু একটি সরকারের কাজ নয় ভবিষ্যতের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার তৈরির প্রশ্ন,” বলেন তিনি।
তিনি পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই উত্তরণের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।


