সবচেয়ে অসুখী প্রজন্ম কোনটা?

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা বিশেষ করে জেন-জি বিশ্বের সব বয়সী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানসিক অশান্তি এবং হতাশার সম্মুখীন হচ্ছে। এই গবেষণাটি ৪৪টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগের ধারণা ছিল মধ্যবয়সী মানুষ সাধারণত মানসিক চাপের শীর্ষে থাকে, কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল তা সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়েছে। তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ এবং মানসিক অশান্তির মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে তারা এখন মধ্যবয়সী এবং বৃদ্ধদের তুলনায় অনেক বেশি অসুখী হয়ে পড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষদের মধ্যে হতাশার হার ১৯৯৩ সালে ছিল মাত্র ২.৫%, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ৬.৬% এ পৌঁছেছে। একই সময়ে মহিলাদের মধ্যে এই হার ৩.২% থেকে ৯.৩% এ উন্নীত হয়েছে। এটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। একই ধারা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও লক্ষ্য করা গেছে। তরুণরা তাদের বয়স্কদের তুলনায় আরও বেশি হতাশা, উদ্বেগ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হচ্ছে।

এর পেছনে নানা কারণ কাজ করছে। বর্তমান তরুণরা স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে অতিরিক্তভাবে যুক্ত। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব কিছু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দেখা ও প্রতিফলিত হওয়ায় তারা নিজের তুলনায় অন্যদের জীবনকে সর্বদা মূল্যায়ন করতে থাকে। এ কারণে আত্মসম্মানহীনতা, সামাজিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং হতাশা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তরুণদের উপর অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সামাজিক সম্পর্কের সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে দুর্বল করেছে।

অর্থনৈতিক চাপও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। বেকারত্ব, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তাহীনতা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ এবং হতাশা বাড়াচ্ছে। শিশু ও কিশোর বয়সে মানসিক নির্যাতন বা বুলিংয়ের মতো অভিজ্ঞতাও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে, যা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশেও তরুণদের মধ্যে মানসিক অশান্তি বেড়ে চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রায় ১৩% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গ্রামীণ এলাকায় এই হার ১৬.৫%। তবে দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে এখনো অনেক সামাজিক অবহেলা এবং স্টিগমা বিদ্যমান। অনেকে মানসিক সমস্যার সম্মুখীন হলেও চিকিৎসা গ্রহণে দেরি করছে বা সাহায্য চাইতে দ্বিধা করছে।

এই গবেষণার ফলাফল আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, তরুণদের মানসিক সুস্থতার দিকে আমাদের নজর দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাদের উদ্বেগ, হতাশা এবং চাপ মোকাবেলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা গ্রহণ না করলে, পুরো সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণদের জন্য সমর্থন, সচেতনতা এবং কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে তারা সুস্থ, সুখী এবং সমাজের জন্য গঠনমূলক জীবনযাপন করতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন