ব্যস্ততার মানে কি সফলতা?
কখনো এমন মনে হয়েছে, একটু বিশ্রাম নিলে যেন অপরাধবোধে ভুগছেন? আপনি হয়তো সপ্তাহান্তে একদিন অলস কাটাতে চেয়েছেন, কিন্তু মনে হয়েছে “আমি যে কিছু করছিই না!” এমন অনুভব আজকের Gen Z ও মিলেনিয়াল প্রজন্মদের মধ্যে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই অনুভবের পেছনে কাজ করছে একটি অদৃশ্য সামাজিক চাপ, যার নাম Toxic Productivity বা বিষাক্ত উৎপাদনশীলতার সংস্কৃতি। এর আরেক নাম Hustle Culture, যেখানে কাজই জীবন, বিশ্রাম মানে অলসতা।
‘হাসল কালচার’ কীভাবে জন্ম নিল?
ইনস্টাগ্রামে “#hustlehard” বা “#grindmode” লিখে খুঁজলে লক্ষ লক্ষ পোস্ট পাবেন। সিলিকন ভ্যালি থেকে ঢাকার স্টার্টআপ তরুণ, সবাই যেন বলছে “চাকরি নয়, নিজের বস হও”, ” পরের জীবনে ঘুমাও”, কিংবা “২৪ ঘণ্টা কাজে দাও”। এই ভাবনার উৎস মূলত ২০০০-এর দশকের আমেরিকান উদ্যোক্তা সংস্কৃতি থেকে, যেখানে স্টিভ জবস বা এলন মাস্কের মত ব্যক্তিত্বরা নিজেদের কাজ-নেশাকে গর্বের প্রতীক বানিয়েছেন। তারপর এই মানসিকতা সোশ্যাল মিডিয়া, ইনফ্লুয়েন্সার কালচার ও ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। বিশেষ করে COVID-১৯ পরবর্তী সময়ে, যখন বাড়িতে বসে কাজের পরিসর অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন মানুষ ২৪/৭ চলমান থাকার অদৃশ্য বাধ্যবাধকতায় পড়ে। হোম অফিস আর অফিসের পার্থক্য মুছে গেলে কাজ না করা মানে হয়ে দাঁড়ায় অপ্রয়োজনীয় হওয়া।
বিশেষত Gen Z ও মিলেনিয়ালরা এই কালচারের প্রধান শিকার। কারণ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় চাকরি হারানোর ভয়, ইনফ্লেশন, হাউজিং ক্রাইসিস ইত্যাদি চাপে তারা মনে করে জীবনের সবসময় কিছু না কিছু করে যেতে হবে। অন্যদের সফলতা দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা বাড়ছে। এই প্রজন্ম আত্মপরিচয় তৈরি করছে কতটা ব্যস্ত সে হিসেব করে। একাধিক গবেষণা যেমন ২০২২ সালে American Psychological Association-এর রিপোর্ট দেখিয়েছে, ১৮-৩৫ বছর বয়সীদের ৭২% বিশ্রাম নিতে গেলেই ব্যর্থ বোধ করেন। ব্যস্ত থাকার জন্যই যেন তাদের সামাজিক মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে।
এই সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো অসুস্থতাকে প্রোডাক্টিভনেসের অন্তরায় হিসেবে দেখা। কেউ যদি বিষণ্নতায় ভোগে, সে নিজেকেই দোষ দেয় আমি দুর্বল, আমি অলস।
বার্নআউট এখন WHO স্বীকৃত মানসিক অবস্থা। বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত, আত্ম-সন্দেহ (Imposter Syndrome) এবং আতঙ্ক (Anxiety) বাড়ছে। ২০২৩ সালের ইউএস সার্জন জেনারেলের রিপোর্ট অনুযায়ী, Gen Z-র মধ্যে মানসিক অবসাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ভারতের একটি সমীক্ষা (LinkedIn, 2021) বলছে, ৮৭% কর্মজীবী মানুষ ওয়ার্ক-ফ্রম-হোমে ক্লান্তি বা Burnout অনুভব করেছেন।
অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম ও বসে থাকা জীবনধারা থেকে হার্ট ডিজিজ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি।
খাবার ও ঘুমের অনিয়ম দৈহিক দুর্বলতা বাড়ায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের বড় অংশ দৈনিক পর্যাপ্ত পানি পান, ব্যায়াম বা সূর্যালোক গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন শুধুমাত্র কাজের চাপে।
সমাজ কি এই বিষক্রিয়া টিকিয়ে রাখছে?
এ প্রশ্নটির উত্তর ‘হ্যাঁ’। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চাকরি বাজার, এমনকি পরিবারও বলে “ব্যস্ত থাকো, “কাজ না করলে মানে তুমি ব্যর্থ”। চাকরি ও ফ্রিল্যান্স প্ল্যাটফর্মগুলো ২৪/৭ অ্যাক্টিভ থাকা উৎসাহিত করে। সংবাদপত্রে “সফল তরুণদের গল্প” মানে এমন কাউকে পাওয়া যে দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করে। এইভাবে এক ধরণের “ক্যাপিটালিস্ট হিরোইজম” তৈরি হয়, যেখানে বিশ্রামহীনতা সাফল্যের সাইন। এমনকি ঘুম, বন্ধুত্ব বা ব্যক্তিগত সময় ব্যয় করাও অনুৎসাহিত হয়।
সৌভাগ্যবশত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু সামাজিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে, “Quiet Quitting” মুভমেন্ট স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য রক্ষায় মার্কিন তরুণদের একটি অংশ চাকরিতে কেবল ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করছে, ওভারটাইম করছে না। “Doing Nothing is Productive” ধরনের বই ও পডকাস্ট জনপ্রিয় হচ্ছে। ইউরোপে “Slow work, mindful living” ট্রেন্ড শুরু হয়েছে, যেখানে কম কাজ করেই বেশি মানসিক শান্তির দিকে নজর। Microsoft Japan, Buffer, Iceland-এর কিছু প্রতিষ্ঠান ৪ দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করে দেখিয়েছে প্রোডাক্টিভিটি বাড়ে, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হয়।অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মীরা যখন সপ্তাহে একদিন কম কাজ করে, তখন তাদের উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ক্লান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
কাজ ও সফলতা’কে একসূত্রে বাঁধা একটা পুরনো সমাজিক গাঁথুনি ভেঙে ফেলার সময় এসেছে। আমাদের প্রজন্মকে বোঝাতে হবে “তুমি মানুষ, মেশিন নও”।বিশ্রাম, অলসতা এবং অনুভব করার জন্য সময় নেওয়াও একটা স্বাস্থ্যের অংশ। ‘কাজ করে যাও’ এই মন্ত্র নয়, বরং ‘কখন থামতে হবে’ এই বোধই ভবিষ্যৎ সমাজের প্রজ্ঞা।


