সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদ গঠন করার কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করে বিএনপি। দলটি বলেছে, আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা উচিত। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলে সংসদে সব আলোচনা হবে। গতকাল রোববার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাছে সংস্কারের সুপারিশ নিয়ে লিখিতভাবে দলীয় মতামত জমা দেয় বিএনপি। পরে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের দলীয় এ অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। সংবিধানের প্রস্তাব পরিবর্তনে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বিরোধিতাও করেছে বিএনপি। দলটি বলেছে, সুপারিশে ১৯৭১ ও ২০২৪ সালকে এককাতারে আনা হয়েছে। এটি তারা সমুচিত বলে মনে করে না। রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করে না দলটি।
বিএনপি বলেছে, যেভাবে সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, তাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তেমন একটা ভূমিকা থাকবে না। এ ছাড়া নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হবে।গতকাল মতামত জমা দেওয়ার পর সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশনের ২০টির মতো প্রস্তাবের মধ্যে বিএনপি ১১টিতে সরাসরি একমত। সাত-আটটিতে মন্তব্যসহ নীতিগতভাবে একমত। একটি প্রস্তাবে ভিন্নমত জানানো হয়েছে।জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২৬টি প্রস্তাবের মধ্যে প্রায় অর্ধেক বিষয়ে তাঁরা একমত, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে তাঁদের মতামত আছে। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর বিষয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিএনপি একমত পোষণ করেছে।
তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিনের সুপারিশের বিষয়ে বিএনপি নিজেদের মতামত তুলে ধরে স্প্রেডশিটের সঙ্গে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করেছে। সংবিধান সংশোধনে গণপরিষদের প্রয়োজন আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, একটি নতুন রাষ্ট্র গঠিত হলে, সেখানে সংবিধান প্রণয়ন করার জন্য গণপরিষদ প্রয়োজন হয়। সেই সংবিধানের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন হয়। ‘এখানে আমাদের কি রাষ্ট্র নতুন হয়েছে?’-এমন প্রশ্ন রেখে বিএনপির এই নেতা বলেন, বাংলাদেশ ৫৩-৫৪ বছরের পুরোনো রাষ্ট্র। একটা সংবিধান আছে। হয়তো সংবিধানের গণতান্ত্রিক চরিত্র নষ্ট হয়েছে। যে কারণে কাঠামোগুলো নতুন করে বিনির্মাণ করা দরকার।
তিনি বলেন, যারা গণপরিষদ দাবি করছে, তারাও ৬৯টা দাবি দিয়েছে। বিএনপি আরও কম দাবি দিয়েছে। এগুলো আলোচনা করে একটা বৃহত্তর ঐকমত্যের ভিত্তিতে এসে ব্যাপক সংশোধিত সংবিধান পাওয়া যাবে। সে সংবিধানকে কেউ নতুন সংবিধান বলতে পারে, এখানে বিএনপির আপত্তি নেই। সালাহ উদ্দিন আহমদ জানান, তাঁরা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের সুপারিশে একমত। তবে উচ্চকক্ষের সদস্য কীভাবে মনোনীত হবে, তা পরবর্তী সময়ে আলোচনা করে নির্ধারণ করা যাবে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। তবে নারী আসনে সরাসরি ভোেট নয়, বিদ্যমান পদ্ধতিতে মনোনয়নের কথা বলেছে তারা।
প্রস্তাবনা সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ উল্লেখ করে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশন সংবিধানের প্রস্তাবনা পুরোপুরি পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রস্তাব করেছে। এটা অনেকটা পুনর্লিখনের মতো। সেখানে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের সঙ্গে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে এককাতারে আনা হয়েছে। এটা সমুচিত বলে বিএনপি মনে করে না। এটাকে অন্য জায়গায় রাখা বা সংবিধানের তফসিল অংশে রাখার বিভিন্ন রকম সুযোগ আছে। পঞ্চদশ সংশোধনের আগের অবস্থায় যে প্রস্তাবনা ছিল, সেটির পক্ষে বিএনপি।
নির্বাহী, আইন ও বিচার-এই তিন বিভাগের বিষয়ে এবং কিছু কমিশন বিশেষ করে সাংবিধানিক কাউন্সিল করে কিছু অনির্বাচিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের যেসব এখতিয়ার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাতে রাষ্ট্রের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের তেমন একটা ভূমিকা থাকবে না। রাষ্ট্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে, এটা হচ্ছে সংবিধানের মূল চেতনা। সাংবিধানিক কাউন্সিল করা হলে, সেটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বাচন কমিশনকে দায়বদ্ধ করার জন্য সংসদীয় কমিটির হাতে ক্ষমতা দেওয়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, বিএনপি সেটির সঙ্গেও একমত নয়। এ ক্ষেত্রে তাঁদের মত হলো, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে, তারাই দায়বদ্ধ করতে পারে।


