পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) এবং নরিনকো পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৭,৫০০ মেগাওয়াটে নিয়ে গেছে। তবে দেশের সর্বোচ্চ চাহিদা এখনও ১৬,৪০০ মেগাওয়াটের সামান্য বেশি, যা নির্দেশ করে বিদ্যুতের জন্য অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি করা হয়েছে। এই অতিরিক্ত ক্ষমতার কারণে সরকারকে কার্যকরভাবে ব্যবহার না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে অযথা খরচ করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতের এই সমস্যা আরও জটিল হয়েছে গ্যাস সংকটের কারণে। নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাট ও খুলনার রূপসায় উচ্চ ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো গ্যাসের অভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশে দৈনিক চাহিদার তুলনায় এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, ফলে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত বিনিয়োগের কারণে বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতে ২০১০-১১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ২ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গ্যাস খাতে এলএনজি আমদানিতে গত দুই দশকে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যেখানে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা।
অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বকেয়া পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার বকেয়া ছিল ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিপিডিবির বকেয়া ৪৫ হাজার কোটি টাকা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধুমাত্র বকেয়া পরিশোধের চেয়ে খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ভর্তুকি কমানো আরও গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৬২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, যা খাতের আর্থিক চাপ কমাতে যথেষ্ট হয়নি। খাত সংশ্লিষ্টরা নির্দেশ করছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কার বলতে বোঝানো হচ্ছে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা জোরদার করা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গ্যাস এবং বিদ্যুৎ খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা জরুরি, যাতে খাতের আর্থিক লোকসান কমানো যায়। এছাড়া বিদ্যুতের ট্যারিফ কাঠামো, রিটার্ন অব ইকুইটি এবং ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর জন্য কার্যকর পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন।
গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ খাতে কিছু কাঠামোগত সংস্কার শুরু করেছে। বিতর্কিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষ বিধান আইন, ২০১০ বাতিল করা হয়েছে এবং পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ কেন্দ্র বন্ধ করা হয়েছে। এছাড়া ট্যারিফ কমানো এবং ব্যয় হ্রাসের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও খাতের দক্ষ ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে সম্পন্ন না হয়, তবে পরবর্তী সরকারের জন্য এ খাত বড় অর্থনৈতিক বোঝা তৈরি করবে। সারসংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মূল সমস্যা হল অতিরিক্ত সক্ষমতা, গ্যাস সংকট, অযথা ভর্তুকি এবং কার্যকরী ব্যবস্থাপনার অভাব। দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত সংস্কার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া খাতের আর্থিক চাপ এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়।


