কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এটিসহ সংবিধান সংস্কারে ৭টি প্রস্তাব তুলে ধরেছে নাগরিক জোট।এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, দেশের বিদ্যমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা দেওয়া আছে। দেশের আইনি কাঠামো, প্রতিষ্ঠানগুলো এমন ছিল যে এখানে স্বৈরাচারের আবির্ভাব সুনিশ্চিত ছিল। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষমতার ভারসাম্য এনে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো।
এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন—এ প্রস্তাবের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, এটি খুব জনপ্রিয় দাবি, এটি তাঁরও দাবি। কিন্তু এই দাবি শুধু করলেই হবে না, ‘কনভিন্সিং আর্গুমেন্ট’ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদে থাকতে পারবেন, এমন বিধান আসলে ভারত, যুক্তরাজ্য কোথাও নেই। এক ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, এমন বিধান করা হলেও একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলে মনে করেন আইন উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো। ভারতে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বা পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন। আর বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে নির্বাহী বিভাগের কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই। প্রধানমন্ত্রীকে অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর প্রসঙ্গ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশ যখন সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রবেশ করল, তখন রাষ্ট্রপতির হাতে যে অভাবনীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, সেই ক্ষমতার প্রতিটি অংশ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তির আধিপত্য—সবকিছু মিলেই এই ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন তৈরি হয়েছে।
আলী রীয়াজ বলেন, ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর ‘টার্ম লিমিট’ করা হয় না। তাই বাংলাদেশেও এটা করা যাবে না—এই যুক্তি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করেছে। এর আগে কোথাও এই ব্যবস্থা ছিল?
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের জন্য জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠনের প্রস্তাব করেছে সংবিধান সংস্কার কমিশন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, অতীতে ব্যক্তিগত পছন্দে নিয়োগ হয়েছে। এনসিসি গঠন করা হলে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের প্রতিনিধিরা একত্রে বসে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, ১৯৯০ সালের লিখিত চুক্তিও রাজনৈতিক দলগুলো মানেনি। ‘নন বাইন্ডিং’ হলে জাতীয় সনদ শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে না।
নাগরিক জোটের অন্যান্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে আছে — নিম্নকক্ষের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা।
সাংবিধানিক নিয়োগ-সংক্রান্ত তারা দুটি বিকল্প বলেছে। একটি হলো নির্বাহী বিভাগের মনোনয়নের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে, আরেকটি হলো জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদের মাধ্যমে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সংসদ বিলুপ্তির দুই মাস আগে ১০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে। সেখানে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে ৫ জন করে সদস্য থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিটির অন্তত ৮ সদস্যের সম্মতির প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘জুলাই সনদের’ উল্লেখ এবং পরিশিষ্ট হিসেবে জুলাই সনদ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।


