জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে ২য় দফা বৈঠকেও সংবিধানের বেশির ভাগ মৌলিক পরিবর্তনের প্রস্তাবে বিএনপি বিরোধিতা করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা পরবর্তী সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া যৌক্তিক বলে মত দিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে, যদি একটি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা তৈরি হয় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত হয়, তাহলে বেশির ভাগ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন—সংবিধান সংস্কার কমিশনের এ সুপারিশের সঙ্গে একমত হয়নি বিএনপি। তারা চায়, একই ব্যক্তি টানা দুবারের পর বিরতি দিয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। বিএনপি-র বক্তব্য – জনগণ যদি কোনো ব্যক্তিকে দুই মেয়াদের পর বিরতি দিয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী করতে চায়, সে সুযোগ সংকুচিত করা উচিত হবে না।
গতকাল বৈঠকে বৈঠকে ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে একটি নতুন প্রস্তাব দেয়া হয়। সেটি হলো এক ব্যক্তি মাঝখানে বিরতি দিয়ে সর্বোচ্চ ৩বার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। এ নিয়ে আলোচনা হলেও সিদ্ধান্ত জানায়নি বিএনপি। তারা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে ।একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না—সংবিধান সংস্কার কমিশনের এমন সুপারিশের সঙ্গেও একমত হয়নি বিএনপি। বৈঠকে বিএনপি বলেছে, একটি দলের প্রধান কে হবেন, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, কে সংসদ নেতা হবেন—এসব ঠিক করার বিষয়টি একান্ত দলের নিজস্ব বিষয়। এসব সংবিধানে ঠিক করে দেওয়া যাবে না।
ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধান সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার অনেকগুলোর সঙ্গে ভিন্নমত জানিয়ে অনড় অবস্থানে ছিল বিএনপি।তবে তারা সাংবিধানিক পদে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াতে পরবর্তী সংসদে একটি আইন করা হবে—এমন প্রস্তাব দিয়েছে। তবে সে আইনে কী কী থাকবে, তার বিস্তারিত জানানো হয়নি। সংবিধান সংস্কার কমিশনের সংস্কার প্রস্তাব তৈরির অন্যতম লক্ষ্য ছিল, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে এবং রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের (আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ) মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা। এ জন্য তারা বেশ কিছু সুপারিশ করেছিল। এর একটি হলো নির্বাহী বিভাগ, আইন সভা ও বিচার বিভাগ—রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল’ (এনসিসি) গঠন করা, যার কাজ হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পদে নিয়োগের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠানো।
এনসিসি গঠনের এ প্রস্তাবের জোরালো বিরোধিতা করে বিএনপির প্রতিনিধিদল। তারা যুক্তি দেয়, এ প্রস্তাব একেবারে নতুন ধারণা। এখানে অনির্বাচিত ব্যক্তিরা থাকবেন। কিন্তু সব দায় নিতে হবে নির্বাচিত সরকারকে। এই কাউন্সিল গঠন করা হলে সরকারের হাত-পা বেঁধে দেওয়া হবে। সরকার হবে দুর্বল। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেক বেশি সংকুচিত হবে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সংবিধান সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে নতুন পদ্ধতি প্রস্তাব করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন নির্বাচকমণ্ডলীর (ইলেকটোরাল কলেজ) সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে। আইন সভার উভয় কক্ষের সদস্যদের প্রত্যেকের একটি করে ভোট, জেলা সমন্বয় কাউন্সিল সামষ্টিকভাবে একটি করে ভোট (৬৪টি জেলা সমন্বয় কাউন্সিল থাকলে ৬৪টি ভোট), সিটি করপোরেশন সমন্বয় কাউন্সিল সামষ্টিকভাবে একটি করে ভোট দেবে।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের এ প্রস্তাবের সঙ্গেও একমত হয়নি বিএনপি। তারা চায় — আইনসভা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হলে উভয় কক্ষের সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।


