“সরকার পরিচালনায় নানা ধরনের অসহযোগিতার মুখে কাজ করতে না পারায় হতাশাবোধ থেকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করতে চান। তিনি আরেকটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিদায় নিতে চান।
… বুধবার ২১ মে সেনাপ্রধান ঢাকা সেনানিবাসে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে যে সভা করেন, সেখানে নির্বাচন, করিডর এবং চট্টগ্রাম বন্দর বিষয়ে তিনি যেসব মন্তব্য করেছেন বলে সংবাদ প্রকাশ পেয়েছে, স্পষ্টতই তাতে সরকারের মতামতের প্রতিফলন ছিল না।
… অথচ ২০ তারিখ রাতে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার একটি বৈঠক হয়েছিল এবং তাতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলে সরকারিভাবে জানানো হয়। সেনা সদরে অনুষ্ঠিত সভায় সেনাপ্রধানের বক্তব্য হিসেবে সংবাদমাধ্যমে যা প্রকাশিত হয়েছে, তা যথার্থ ছিল না—এমন কোনো দাবি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে করা হয়নি। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার কিছুটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে বলেই সরকারের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
… ২১ মে সেনাপ্রধান ঢাকা সেনানিবাসে তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে যখন সভা করেন, সেই একই দিনে ফেসবুকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্তত ২৪টি ভুয়া তথ্য খণ্ডন করেছে। এগুলোর মধ্যে ছিল প্রধান উপদেষ্টাকে ক্ষমতাচ্যুত করা, সেনাপ্রধানকে অপসারণ ও গ্রেপ্তার করার মতো ভুয়া তথ্য। স্পষ্টতই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকেরা নানাভাবে দেশে যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, এগুলো তারই অংশ। তবে দেশের ভেতরেও যে একাধিক গোষ্ঠী একই রকম চেষ্টায় জড়িয়ে পড়েছে, এমন সন্দেহও প্রবল।
… যে বিষয়টি এখন রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হলো, সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রশ্ন। নির্বাচনকে সংস্কারের শর্তসাপেক্ষ করার বিষয়টি গণ-অভ্যুত্থানের পর যতটা প্রবল ছিল, গত ৯ মাসে তা অনেকটাই মিইয়ে এসেছে। শাসনব্যবস্থার প্রায় সব জায়গায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও তা সম্পন্ন করা যে সময়সাপেক্ষ, সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু ন্যূনতম সংস্কারের অগ্রগতি দৃশ্যমান না হওয়ায় ধৈর্যচ্যুতি ঘটাও তো স্বাভাবিক। একদিকে প্রতিশ্রুত সংস্কারের শ্লথগতি, অন্যদিকে শাসনকাজে দুর্বলতা বা ক্ষেত্রবিশেষে অক্ষমতাও প্রধান উপদেষ্টার হতাশার অন্যতম কারণ বলেই জানা যাচ্ছে।
… প্রশাসন ও পুলিশে রাজনৈতিক দলগুলো স্টেক নিয়ে বসে থাকুক বা না থাকুক, রাষ্ট্রের এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। নির্বাচনে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে বলে তাদের বিশ্বাস, তারা ইতিমধ্যেই সেসব দলের আস্থা অর্জনে নেতা-নেত্রীদের তদবির রক্ষায় ব্যস্ত। সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নে তাঁদের অধিকাংশেরই ন্যূনতম আন্তরিকতা নেই, আগ্রহও নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসছে না। কারণ, বিনিয়োগকারীরা স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা চান। অন্য কথায়, তাঁরাও নির্বাচনের অপেক্ষায় আছেন। সেনাবাহিনীও নির্বাচনের বিষয়ে একই অবস্থান নিয়েছে।
ক্ষমতার অনেকগুলো ভরকেন্দ্রকে আস্থায় রাখা নিঃসন্দেহে খুব বড় একটা চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার কারণে তা যথাযথভাবে সামাল দিতে পারেনি।…রাজনৈতিক দলগুলোকে আস্থায় রাখার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল।
… প্রধান উপদেষ্টা তাঁর প্রথম ভাষণেই বলেছিলেন, কখন নির্বাচন হবে, সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, নির্বাচনের প্রশ্ন নিয়েই এখন সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সুতরাং প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ ও হতাশার ঊর্ধ্বে উঠে সংকট নিরসনে উদ্যোগী হবেন এবং সব দলকে ডেকে আবারও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবেন বলেই দেশবাসী আশা করে। “


