কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন আমরা মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্পে বিশ্বাস করি যার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই? কেন হঠাৎ করেই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে “সবকিছুই আসলে গোপন কোনো চক্রান্তের ফল”? এটি এমন এক অদ্ভুত সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক খেলা যা কেবল ইতিহাসেই নয়, আমাদের বর্তমানেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের শিকড় কোথায়?
প্রথমেই চলুন একটু ইতিহাসে যাই। ৩৩১ খ্রিষ্টপূর্বে রোম নগরীতে হঠাৎ করে অনেক প্রভাবশালী পুরুষ মারা যেতে লাগলেন। তখন এক দাসী দাবি করল, শহরের অভিজাত নারীরা নাকি গোপনে বিষ তৈরি করছে! তদন্তে দেখা গেল, সত্যিই কিছু ওষুধ বানানো হচ্ছিল, কিন্তু সন্দেহ হল এগুলো কি বিষ, নাকি চিকিৎসার জন্য? দু’জন নারী নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে সেই ওষুধ খেয়ে ফেললেন, সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন। এরপর ব্যাপক গ্রেপ্তার, ১৭০ জন নারী অভিযুক্ত। কিন্তু ইতিহাসবিদ লিভি মনে করেন, আসলে শহরে কোনো মহামারী চলছিল, আর এই ষড়যন্ত্রের গল্পটা বানানো হয়েছিল মানুষের আতঙ্ককে ব্যাখ্যা করতে।
কেন ছড়িয়ে পড়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব?
ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এগুলো আমাদের সমাজের গভীর উদ্বেগ, ভয় আর সন্দেহকে তুলে ধরে। আধুনিক যুগে ৫জি টাওয়ার নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিল, নতুন করোনাভাইরাস নাকি এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়াচ্ছে! যুক্তরাজ্যে ৭৭টি টাওয়ার ও ৪০ জন ইঞ্জিনিয়ারের ওপর হামলা হয়েছিল এই গুজবের কারণ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন মানুষ এমন গল্পে বিশ্বাস করে? গবেষকরা বলছেন, সমাজে যখন অস্থিরতা, সংকট বা অনিশ্চয়তা বাড়ে, তখন মানুষ সহজ ব্যাখ্যার খোঁজে ছুটে। কোনো জটিল ঘটনা বা অজানা বিপর্যয় হলে আমরা চাই, একে কোনো খারাপ লোক বা গোপন শত্রুর ওপর দোষ চাপাতে।
ইতিহাসজুড়ে দেখা যায়, ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সবসময়ই সঠিক খলনায়ক থাকে। রোমে অভিজাত নারী বা দাস, আধুনিক সমাজে কখনো ধর্মীয় সংখ্যালঘু, কখনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কখনো বিদেশি শক্তি। এইভাবে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সমাজের বিদ্যমান ভয়, সন্দেহ আর বিভাজনকে কাজে লাগায়।
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব শুধু ভয় নয়, আমাদের “আমরা বনাম ওরা” মানসিকতাকেও উস্কে দেয়। এতে একদিকে নিজের দল বা পরিচয় নিয়ে গর্ব তৈরি হয়, অন্যদিকে “বাইরের শত্রু”কে দোষারোপ করা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব সমাজে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বা বিভাজন বেশি সেখানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বেশি জনপ্রিয় হয়।
আমরা গল্প ভালোবাসি। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে থাকে নাটকীয় খলনায়ক, গোপন পরিকল্পনা, নৈতিক শিক্ষা সব মিলিয়ে এক টানটান গল্প! তাই সহজ, সরল সত্যের চেয়ে এমন গল্প আমাদের বেশি টানে। যেমন, “একটি ভাইরাস হঠাৎ এল, হাজার হাজার মানুষ মারা গেল” এটা শুনতে একঘেয়ে, তার চেয়ে “গোপন শক্তি ভাইরাস ছড়িয়েছে” এটা অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।
অনেক সময় কোনো ঘটনা বা বিপর্যয়ের পর সরকার বা বিজ্ঞানীরা দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে পারেন না। তখন তথ্যের শূন্যতা আর মানুষের সন্দেহ একসাথে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দেয়। ১৯৯০-এর দশকে এক বিজ্ঞানী ভুলভাবে দাবি করেছিলেন, এমএমআর ভ্যাকসিনে অটিজম হয়। পরে বহু গবেষণায় সেটা ভুল প্রমাণিত হলেও, এর মধ্যে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে, অনেক ক্ষতিও হয়ে যায়।
আগে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতো মুখে মুখে, এখন ছড়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায়। একবার কোনো গুজব ছড়িয়ে পড়লে, সেটা নিয়ে আলোচনা, হাস্যরস, প্রতিবাদ সবই আসলে সেই গল্পকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। আজকাল অনেক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দেশ-কাল-সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়।
আগে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়াতো সমাজের প্রান্তিক মানুষ, এখন অনেক সময় ক্ষমতাবানরাও এসব ছড়ান নিজেদের স্বার্থে। করোনা নিয়েও বিভিন্ন দেশের নেতারা নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়েছেন, যাতে তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা সামনে আসে। এতে সমাজ আরও বিভক্ত হয়, সত্য-মিথ্যার সীমা আরও ঝাপসা হয়ে যায়।
কীভাবে সামলাবো?
ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমাদের সমাজের গভীর উদ্বেগ, বিভাজন আর তথ্যের শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এগুলো যেমন আমাদের গল্প বলার প্রবণতার ফসল, তেমনি কখনো কখনো বড় বিপদের কারণও হতে পারে। তাই কোনো নতুন গল্প বা গুজব শুনলে, একটু ভাবুন এটা কি সত্যিই যুক্তিসঙ্গত? নাকি আমাদের ভয়, সন্দেহ আর গল্পের প্রতি ভালোবাসার সুযোগ নিয়ে কেউ আমাদের ভুল পথে চালাচ্ছে?


