ষড়যন্ত্র তত্ত্বে – ‘নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু’র মৃত্যু

১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট জাপানের তাইহোকু (বর্তমান তাইপেই, তাইওয়ান) বিমানবন্দরে এক জাপানি বোমারু বিমান রানওয়ে থেকে আকাশে উড়লো।গন্তব্য ছিল সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড মাঞ্চুরিয়া। সেই বিমানে ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

প্রচলিত ইতিহাস বলে বিমানটি উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিন বিকল হয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। আগুনে পুড়ে সুভাষচন্দ্র গুরুতর আহত হন এবং রাতেই তাইহোকু সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর দেহ সৎকার করা হয় জাপানের রেনকোজি মন্দিরে।

কিন্তু এই অফিসিয়াল কাহিনি কি নিখুঁত সত্য? নাকি এটি একটি সুচিন্তিত মোড়ক, যেটির আড়ালে রাজনৈতিক গোপন খেলা লুকিয়ে ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা প্রবেশ করি ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ও রহস্যাবৃত অধ্যায়ে— “নেতাজির মৃত্যু রহস্য”।

প্রথমত দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর সংখ্যা খুবই কম। যারা ছিলেন তাদের বর্ণনা পরস্পরবিরোধী। জনৈক হাবিবুর রহমান এবং জাপানি কর্মকর্তা লিয়েইসো তাচিবানা বলেছিলেন, বিমানবন্দরে আগুন লাগার পর সুভাষচন্দ্র দগ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু চিকিৎসার সময় তিনি সম্পূর্ণ সচেতন ছিলেন এবং মৃত্যুর আগে “India is free” বলেছিলেন। কিন্তু মেডিকেল রিপোর্ট এবং মরদেহের ছবি কখনও প্রকাশ্যে আসেনি। এমনকি তাইহোকু হাসপাতালের মৃত্যুর নথিপত্রও রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যায়। এই তথ্য-অসামঞ্জস্য থেকেই জন্ম নেয় প্রথম সন্দেহ।

১৯৫৬ সালে ভারতের শাহনাওয়াজ কমিশন এবং ১৯৭০ সালে খোসলা কমিশনের তদন্তও নিশ্চিত প্রমাণ খুঁজে পায়নি। বরং রাশিয়া-পন্থী বিশ্লেষক ও সাংবাদিক অনুজ ধরসহ অনেক গবেষক বলেন, নেতাজি আসলে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাননি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নেন।

এর পেছনে তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে সুভাষচন্দ্র জাপান ও জার্মানির মিত্র হয়েছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করে তিনি ভারতের স্বাধীনতার জন্য সামরিক পথ বেছে নিয়েছিলেন। যুদ্ধশেষে তিনি বুঝতে পারেন, জাপানের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। ফলে পরবর্তী কৌশল হিসেবে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য নিতে চেয়েছিলেন। জানা যায় সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা এনকেভিডি (পরবর্তী কেজিবি) এর সাথে তার যোগাযোগ ছিল। অনেকে মনে করেন, নেতাজি বিমানপথে মাঞ্চুরিয়া পাড়ি দিয়ে সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পৌঁছান এবং সেখান থেকে তাকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেওয়া হয়।

১৯৯৫ সালে রাশিয়ার জাতীয় আর্কাইভ এবং সোভিয়েত যুগের কিছু নথিপত্রে নেতাজির সম্ভাব্য উপস্থিতির ইঙ্গিত মেলে। তবে ভারতীয় সরকার বারবার রাশিয়া থেকে তথ্য আনতে গড়িমসি করেছে। এই গোপনীয়তাও সন্দেহ বাড়ায়।

কেন লুকিয়ে থাকতে চাইবেন? এখানেই আসে রাজনৈতিক প্রশ্ন। ১৯৪৫-৪৭ সময়কাল ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। যদি প্রমাণিত হতো যে নেতাজি জীবিত আছেন এবং তিনি সোভিয়েতপন্থী (এবং কমিউনিস্ট শক্তি সমর্থিত), তাহলে ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর ক্ষমতার ভারসাম্য নাটকীয়ভাবে পাল্টে যেতো। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নেতৃ্ত্বাধীন কংগ্রেস কোনোভাবেই চাননি এই পরিস্থিতি। নেতাজির উপস্থিতি ব্রিটিশ প্রশাসন এবং ভবিষ্যৎ ভারতীয় নেতৃত্ব, উভয়ের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতো।

সুতরাং তত্ত্ব অনুসারে, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতের তৎকালীন নেতৃত্বের সমঝোতায় নেতাজি সারা জীবনের জন্য অন্তরালে থাকতে রাজি হন। ১৯৮৫ সালে উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদে মারা যান এক রহস্যময় সাধু, যিনি “গুমনামী বাবা” নামে পরিচিত ছিলেন। তার কক্ষে উদ্ধার হয় বহু ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, যার মধ্যে অনেকেই তাকে “নেতাজি” বলে সম্বোধন করেছেন। তার সংগ্রহে ছিল আজাদ হিন্দ বাহিনীর নথি, সুভাষচন্দ্রের পারিবারিক ছবি এবং রাশিয়ার পত্রিকা। যদিও ডিএনএ পরীক্ষা নিশ্চিত প্রমাণ দেয়নি, অনেক গবেষক মনে করেন, গুমনামী বাবাই আসলে অন্তরালে থাকা সুভাষচন্দ্র বসু।

ভারত সরকার ২০১৬ সালে নেতাজি-সংক্রান্ত ৩০০টির বেশি গোপন ফাইল প্রকাশ করে। তাতে মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলে না। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, “নেতাজির মৃত্যু রহস্য থেকে মুক্তি প্রয়োজন”। এখনও পর্যন্ত নেতাজির মৃত্যু নিয়ে কোন নির্ভরযোগ্য একক সূত্রের প্রমাণ নেই। সুভাষচন্দ্র বসুর মতো এক বিপ্লবীর মৃত্যু এতটা অস্পষ্ট থেকে যাওয়া নিঃসন্দেহে রহস্যজনক। হয়তো সত্যি তিনি সোভিয়েত আশ্রয়ে বেঁচে ছিলেন। হয়তো সত্যি বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন। কিন্তু একথা নিশ্চিত, ইতিহাসের পাতায় নেতাজির শেষ অধ্যায় যতদিন অস্পষ্ট থাকবে, ততদিন এই রহস্য ভারতের রাজনৈতিক ও জনমানসে অমর থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন