“… চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের ভেতর শতাধিক জন ছিলেন সরাসরি শ্রমজীবী। আবার আহতদের মাঝেও শত শত জন শ্রমজীবী পরিবারের। কোটার মতো শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ইস্যুতে এই আন্দোলন শুরু হলেও শ্রমিকদের দিক থেকে এই গণঅভ্যুত্থানে এত বিপুল অংশগ্রহণের কারণ কী? কারণ দুটি। প্রথমত, আন্দোলনের বৈষম্যবিরোধী শ্লোগান ও অঙ্গীকার। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের আগের দুই বছরে শ্রমজীবীদের আয় রোজগারের বিপন্নতা।
… সমস্যা হলো, গত ৮-৯ মাসে এর কোনোটিই তেমন হয়নি। বাংলাদেশে ৪২টি খাতে মজুরি নির্ধারিত করা হয়েছে বিগত সময়ে। এই সরকারের সেগুলো আপডেট করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। আবার মার্কেট সিন্ডিকেটগুলো এখনও পণ্য বাজার ভালোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করছে। এর বাইরে শ্রম আইনের সংস্কার বা শ্রমিক জীবনের মানোন্নয়েও সরকার উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার করতে পারেনি এখনও।
… শ্রম কমিশন অনেকগুলো সুপারিশ ও প্রস্তাব দিয়েছে। এবারের মে দিবস হলো গণঅভ্যুত্থানের সরকার প্রথম মে দিবস। আমি মনে করি, এবারের মে দিবসে শ্রম কমিশনের সুপারিশের ৫-১০টি বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়া উচিত।…শ্রম কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়নযোগ্য এবং বাস্তবায়ন করা জাতীয় স্বার্থে দরকার।
…আমি মনে করি রাজনৈতিক-সামাজিক চাপ না থাকলে সম্ভবত শ্রম কমিশনের অনেক সুপাারিশই বাস্তবায়ন হবে না। কে সেই চাপ দিবে? শ্রমিকরা তো অসংগঠিত। রাজনৈতিক দলগুলোতে তাদের উপস্থিতিও দুর্বল। ফলে আপাতত খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না।
… এটা একটা জাতীয় লজ্জা ও জাতীয় ব্যর্থতা যে রানাপ্লাজার মতো ঘটনারও বিচার শেষ হলো না আজ পর্যন্ত। রানাপ্লাজার ঘটনা প্রমাণ করে, শ্রমিক জীবন আমাদের রাজনীতির কাছে, আমাদের প্রশাসনের কাছে মোটেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। শ্রমিকদের লাশ ও রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক উল্লাস করতে আমরা মোটেই লজ্জিত নই।
… শ্রমিকদের প্রতি অবজ্ঞা, তাদের অমর্যাদা এখানে সামাজিক কাঠামোর অংশ। আমাদের অর্থনীতি পুঁজিতান্ত্রিক হলেও এখানে সমাজ জীবনে কুৎসিত সামন্তীয় সংস্কৃতি বিদ্যমান। শ্রম ও শ্রমিককে এখানে মর্যাদার সঙ্গে দেখতে শেখেনি সমাজ। তবে এর কারণ রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক।
আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সংস্কার হয়নি। রাজনীতি এখনও কিছু পরিবার নিয়ন্ত্রণ করছে। শিল্প প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিচালিত হয় আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে সামন্তীয় কায়দায়। এসব বন্ধ করতে রাষ্ট্রের আমূল ও গণতান্ত্রিক সংস্কার দরকার। চব্বিশের অভ্যুত্থান তো তাই চেয়েছিল।
খেয়াল করে দেখুন, এখানকার রাজনীতি ও প্রশাসন খোদ অন্যান্যদেরও খুব একটা মানুষ মনে করে না। সামান্য একটা কোটার আন্দোলন থেকে দেশে দেড় হাজার মতো মানুষ হত্যা করে ফেলা হলো মাত্র দেড় মাসে। বিশ্বে এমন নজির বিরল।
আমাদের এই রাজনীতি, এই প্রশাসন, এই রাষ্ট্র অসুস্থ। এখানে শ্রমিকরা বেশি শিকার। কিন্তু অন্যরাও মোটেই নিরাপদ নয়। আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীও যে যেখানে কাজ করে সেখানে তাদের মানবিক সার্বভৌমত্বহীন গবাদিপশুর মতোই দেখা হয় কমবেশি। এখানে শ্রমিকের, কর্মীর জীবন গবাদিপশুর ইমেজ থেকে মুক্তি চায়।”


