অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় শিল্পাঞ্চল ও গ্রামীণ এলাকায় শ্রমিকদের জন্য কার্ডভিত্তিক রেশন দেওয়ার সুপারিশ এসেছে।
মাথাপিছু রেশনের পরিমাণ কতটা হবে, সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে কত টাকা লাগবে, অর্থের যোগান কোথা থেকে আসবে, ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কে পালন করবে – এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “খাদ্য মূল্যস্ফীতির জন্য তো শ্রমিক দায়ী না। এটা রাষ্ট্রের নৈতিক দায় তাদের রেশন দেওয়ার। শ্রমিকরা রেশন পেলে তাদের পুষ্টি বাড়বে, যা উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হবে।”
বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) শিল্পের অবদান ২১%। এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। শিল্পের ৫০%ই উৎপাদন খাতের, আর উৎপাদনের ৮০% অবদান তৈরি পোশাক শিল্পের।
সুতরাং দেশের অর্থনীতির স্বার্থেই পোশাক খাতের শ্রমিকদের রেশন দেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক বিনায়ক সেন।
রেশন দিতে বছরে কত টাকা লাগবে তা নিয়ে এখনো কোনো ধারণাপত্র তৈরি করেনি কোনো পক্ষ। তবে রাজধানীর একটি সেমিনারে এ বিষয়ে নিজের পর্যব্ক্ষেণ তুলে ধরেছিলেন বিনায়ক সেন। তিনি বলেছিলেন, মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশে নেমে না আসা পর্যন্ত রেশন দিতে পারলে জাতীয় উৎপাদন ব্যবস্থা ঠিক থাকবে।
“রেশন বাবদ শ্রমিক প্রতি অন্তত এক হাজার টাকার ভর্তুকি দিলে মাসে ৪০০ কোটি টাকা লাগবে। বছরে যা প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার মত। সরকার জাতীয় বাজেটে এ পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে।’’
মোটা দাগে বললে (পোশাক শ্রমিকদের জন্য) রেশন বাবদ সরকারকে প্রতি বছর বাজেটে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে প্রাথমিক পর্যায়ে। এখন এই অর্থের উৎস কী হবে, সে বিসয়ে কোনো প্রস্তাব করেনি সরকার, শ্রমিক পক্ষ বা শ্রমিক সংগঠনগুলো।
বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট জাহিদ হোসেন মনে করেন, রেশনের জন্য অর্থায়নে সরকারকে আয় বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে বা অন্য কোনো ভর্তুকি কমিয়ে দিয়ে সেই অর্থ এ খাতে কাজে লাগাতে হবে।
রেশন বা নগদ অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ব্যবস্থাপনায়; অর্থাৎ প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে তা পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সরকারের অর্থ প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছানোর দায়িত্ব একটি সংস্থাকে পালন করতে হবে।
জাহিদ হোসেন বলছেন, বিশাল এই শ্রমঘন শিল্পে রেশন সংগ্রহ, কেনাকাটা, ওয়্যার হাউজে পাঠানো ও সবশেষ কারখানা গেইটে পৌঁছানোর মত বিরাট কর্মযজ্ঞ চালানোর সক্ষমতা টিসিবির নেই।
তাছাড়া ৫ হাজার কোটি টাকার সহায়তা পৌঁছে দিতে আরো কত টাকা খরচ যোগ হবে, তারও কোনো গবেষণা নেই।
“সাধারণ কথায় বললে প্রস্তাবটি ভালো শোনায়। কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে, অর্থের উৎস কী হবে, টাকা বা খাদ্য যাই দেওয়া হোক না কেন, তার সুফল অর্থনীতিতে কী হবে। এসব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা হওয়ার পরই বিষয়টি বিবেচনার যোগ্যতা রাখে,” বলেন জাহিদ।
শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও মেট্টোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআিই) সভাপতি কামরান টি রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে মালিক-শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়ন নেতাসহ সবার সঙ্গে কথা বলে এর বাস্তবায়ন করতে হবে।
“রেশনের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেছেন। এখন সরকার মূল্যায়ন করে দেখতে পারে। তখন বাস্তবায়নের বিষয়টি আসবে।”
সরকারের সিদ্ধান্তের পর অর্থের যোগান ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী।
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শ্রমিকদের কল্যাণে শ্রম সংস্কার কমিশন অনেকগুলো সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে শ্রমিকদের রেশন দেওয়ার বিষয়টিও আছে, আরও অনেক কিছু আছে। মে দিবস পার হওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে বসে যেটা যেটা বাস্তবায়ন করা যায় করব।”


