গত সাত মাস ধরে শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার যেরকম কঠোর গোপনীয়তা ও সুরক্ষা বলয়ে ঘিরে রেখেছে, তা প্রায় নজিরবিহীন। লক্ষ্যণীয় হলো, তিনি ঠিক কোথায় আছেন বা কীভাবে আছেন, তা নিয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে এখনও একটি শব্দও জানানো হয়নি।তবে এর মাঝে তিনি বেশ কয়েকবার ফেসবুকে এসে দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে লাইভ অডিও ভাষণ দিয়েছেন এবং সেগুলো রীতিমতো আগেভাগে ঘোষণা করেই করা হয়েছে। এছাড়া তার বহু কল রেকর্ডের অডিও-ও ফাঁস হয়েছে।দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা সবাই একমত যে, ভারত ‘অনুমতি’ দিয়েছে বলেই তার পক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এসব ভাষণ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। হোস্ট কান্ট্রি ভারত না চাইলে শেখ হাসিনা কখনোই এভাবে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারতেন না।
এরকমই একজন বিশ্লেষক বলছিলেন, ‘ভারতে বসেও যে তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আছেন এবং দলের কর্মী-সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এই বার্তাটা দিতেই শেখ হাসিনার স্পিচ বা টেলিফোন কলগুলো অ্যালাউ করা হচ্ছে। তবে ভারত মনে করছেড় এর জন্য আপাতত লাইভ অডিওটুকুই যথেষ্ঠ, ছবি বা ভিডিও-র কোনও প্রয়োজন নেই।’সাউথ ব্লকের একটি সূত্রের কথায়, ‘তিনি ভারতের সম্মানিত অতিথি হিসেবে এ দেশে আছেন এবং সেভাবেই তিনি যতদিন খুশি এদেশে থেকে যেতে পারেন তাতে অসুবিধার বিন্দুমাত্র কিছু নেই। তা ছাড়া তিনি কিন্তু পলিটিক্যাল অ্যাসাইলামের জন্য কোনও আবেদনও করেননি।’
ভারতে বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করছেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়ে পাকাপাকিভাবে ভারতেই থিতু হচ্ছেন’-এমন কোনও ধারণা ভারত তৈরি করতে চায় না বলেই সম্ভবত ‘রাজনৈতিক আশ্রয়’ দেওয়ার কথা এখন ভাবাও হচ্ছে না।ভারতের কর্মকর্তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন-যেসব অভিযোগ বা মামলার ভিত্তিতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ ফেরত চাইছে, সেগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। তা ছাড়া শেখ হাসিনাকে যদি বিচারের জন্য ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে তিনি সে দেশে সুষ্ঠু ও ন্যায় বিচার পাবেন, এটাও বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পারেনি বলে ভারত মনে করছে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তিতে এমন বেশ কিছু বিধান আছে, যেগুলোর ভিত্তিতে উপরোক্ত যুক্তিগুলোর আলোকে কাউকে ফেরানোর অনুরোধ অনায়াসে নাকচ করা যেতে পারে।শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারত একই পথে হাঁটবে বলেই স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অথবা নানা অজুহাতে দিনের পর দিন বাংলাদেশের অনুরোধ ফেলে রাখা হবে, কোনও ব্যবস্থাই নেওয়া হবে না!শেখ হাসিনা ভারতে শুধু ভিভিআইপি-ই নন, তার জীবনের ওপরও ঝুঁকি থাকতে পারে বলে ভারত মনে করছে। ফলে বাইরে স্বাভাবিকভাবে বেরোনো বা সামাজিক মেলামেশার কোনও প্রশ্নই ওঠে না।কয়েকটি সেসনে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল নিজে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যাচ্ছে।
এছাড়া তিনি দিল্লিতে আগে থেকে চিনতেন বা যাদের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধুত্ব আছে, এমন হাতেগোনা কারও কারও সঙ্গেও তার দেখা করিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বাংলা ট্রিবিউন জানতে পেরেছে। এটার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, যাতে বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসেও তিনি মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতে পারেন এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা বলে হালকা হতে পারেন।ভারতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পথ প্রশস্ত হওয়া খুব মুশকিল। তিনি নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নটাও এতকাল অস্পষ্ট করে রেখেছেন।ভারত সরকার অধীর আগ্রহ ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে নজর রাখছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি কোন্ পথে এগোয়। সম্ভবত তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে এই হাই-প্রোফাইল অতিথিকে নিয়ে ভারতই-বা শেষ পর্যন্ত কী করতে চায়!


