ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত নাট্যকার যাঁর নাটক এবং কবিতা আজও পৃথিবীজুড়ে পাঠিত হয়, তিনি উইলিয়াম শেকসপিয়ার। জেনে অবাক হবেন যে, তাঁর আসল চিত্রকর্মের খোঁজ এখনও শেষ হয়নি। শেকসপিয়ারের সময়কালীন কোন ছবি বা কোথাও তার সঠিক চেহারা পাওয়া সম্ভব হয়নি। নানা চিত্রকর্মের মধ্যে কখনোই তিনি যেন সঠিকভাবে ফুটে ওঠেননি। তবে সম্প্রতি এমন একটি চিত্রকর্ম সামনে এসেছে যা হয়তো শেকসপিয়ারের আসল চেহারার রহস্য উন্মোচন করতে পারে।
এই কাহিনীর শুরু হয় স্টিভেন নামক এক ব্যক্তির পরিবার থেকে। স্টিভেন আইলসবেরি, বাকিংহামশায়ারে বসবাস করেন। তিনি জানিয়েছেন, তার বাবা পিটার ১৯৬০-এর দশকে ₤৯০০ দিয়ে একটি চিত্রকর্ম কিনেছিলেন, যেটি বহু বছর ধরে স্রেফ তাদের বাড়ির টেলিভিশনের উপরে ঝুলছিল। তবে স্টিভেন কখনোই এই চিত্রকর্মটিকে ভালোভাবে দেখতেন না এবং কোনো বিশেষ আগ্রহ ছিল না। স্টিভেন বলেন, “বাড়ির যে কোন কোণ থেকেই পেইন্টিংটিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যাবে! এটা অনেকসময় বিরক্তিকর। এটি সবসময় আমাকে Scooby Doo সিরিজের রহস্যময় চিত্রকর্মগুলোর কথা মনে করিয়ে দিত।”
এই চিত্রকর্মটির প্রতি স্টিভেনের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে বদলে যায় যখন তার বাবা একদিন এক ইংরেজি ও চারুকলার অধ্যাপকের কাছে চিত্রকর্মটির কথা বলেন এবং সেই অধ্যাপক প্রথমবারের মতো চিত্রটির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করেন। প্রাথমিকভাবে অধ্যাপক মহিলাটি এটিকে একটি রিপ্রডাকশন প্রিন্ট বলে মনে করেছিলেন। তবে পিটার তাকে জানান এটি আসল চিত্রকর্ম। অধ্যাপক আইগ্লাস বের করে দেখেন এবং বলেন, “এটি শেকসপিয়ারের চেহারার চেয়ে বেশি শেকসপিয়ারের মতো।”
এই চিত্রকর্মটি ৩১ বছর বয়সী শেকসপিয়ারের প্রতিকৃতি হিসেবে পরিচিত হয়েছে। সেখানে শেকসপিয়ারকে দাড়ি ছাড়া, সাধারণ চুলে চিত্রিত করেছে, যা এখন পর্যন্ত ইতিহাসের কোনো শেকসপিয়ারের চিত্রে দেখা যায়নি। ঐতিহাসিক চিত্রকর্মগুলির তুলনায় এই চিত্রে শেকসপিয়ারের পরিচিত চেহারা ভিন্ন এবং এটি একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে দেখার সুযোগ দেয়। বিশেষজ্ঞরা এটিকে শেকসপিয়ারের একটি নতুন প্রতিকৃতি হিসেবে দেখছেন।
এছাড়াও চিত্রকর্মটির পেছনে একটি রহস্যময় রাজকীয় প্রতীক (coat of arms) লুকানো ছিল, যেটি পরে বিশেষজ্ঞদের তদন্তের মাধ্যমে বের হয়ে আসে। তারা ধারণা করেন, এই প্রতীকটি শেকসপিয়ারের চেহারা বা পরিচয় সম্পর্কিত কোনো গোপন তথ্য ধারণ করে। প্রতীকটির উপস্থিতি চিত্রের অন্তর্নিহিত রহস্যকে আরো গভীর করেছে।
স্টিভেন চিত্রটির সত্যতা যাচাই করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি শেকসপিয়ারের অন্যান্য জনপ্রিয় প্রতিকৃতির সাথে এই চিত্রকর্মটির তুলনা করেন। ফলস্বরূপ চিত্রটি ঐতিহ্যবাহী শেকসপিয়ারের ছবির তুলনায় অনেক বেশি একীভূত এবং এটি শেকসপিয়ারের মুখাবয়বের কাছাকাছি। বিশেষজ্ঞরা আরও বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, চিত্রের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলিও সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়েছে, যেমন অতিরিক্ত বিবরণ এবং কাঁচামাল যোগ করা হয়েছে।
এই চিত্রকর্মটি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। শিল্প বিশেষজ্ঞ ড. জন গিলক্রিস্ট জানান, “এটি শেকসপিয়ারের সময়কালীন একটি আসল চিত্রকর্ম হতে পারে, তবে আমি এখনো নিশ্চিতভাবে বলব না যে এটি শেকসপিয়ার।” তবে অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা একমত যে এটি শেকসপিয়ারের সময়কালীন একটি আসল চিত্রকর্ম । বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম Mona Lisa এর বিশ্লেষণ টিম প্যারিসের লুমিয়ের টেকনোলজি এই চিত্রকর্মের ব্যাপারে তাদের মতামত প্রকাশ করেছে। লুমিয়ের টেকনোলজির প্রধান নির্বাহী জঁ পেনিকো বলেন, “এই চিত্রটি শেকসপিয়ারের আসল চেহারার সাথে অনেক মিল রয়েছে, এবং এখানে সম্ভবত তাকে তার নিজ চরিত্রেই অভিনয় করতে দেখা যাচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শেকসপিয়ারের আসল চিত্রকর্ম হলে তবে এটি ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে দাঁড়াবে। এটির মূল্য হতে পারে ₤১০০ মিলিয়ন থেকে ₤২০০ মিলিয়ন পর্যন্ত। স্টিভেন প্রথমে এটি বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করতে চাইলেও এখন তিনি কেবল সত্যের সন্ধানেই আগ্রহী। স্টিভেন তার এই চিত্রকর্মের দুঃসাহসিক অনুসন্ধান নিয়ে Netflix-এ একটি ডকুমেন্টারিও তৈরি করেছেন, যার নাম ‘The Stuff of Dreams’। এই অনুসন্ধানটি দেখানোর মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে জানান, সত্যের সন্ধান একটি একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রা, যেখানে প্রাথমিক উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন থেকে শেষ পর্যন্ত সত্যের প্রতি ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।
এই রহস্যময় চিত্রকর্মটি যদি আসলেই শেকসপিয়ারের প্রতিকৃতি প্রমাণিত হয়, তবে এটি পৃথিবীজুড়ে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে স্থান পাবে এবং শেকসপিয়ারের আসল চেহারার রহস্যের সমাধান হবে।


