এপ্রিল ২০২৫ মাসে একটি উচ্চপর্যায়ের জার্মান ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা। এই প্রতিনিধিদলে জার্মান পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, দেশটির রপ্তানি ঋণ সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তারাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সফরকালে প্রতিনিধিদল ঢাকায় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২৫-এ অংশগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্ভাব্য বিনিয়োগ সম্পর্কে আলোচনা করে। সফরের সমন্বয় করে জার্মান এশিয়া-প্যাসিফিক বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (ওএভি), যা এশিয়াজুড়ে জার্মান ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রচারের জন্য কাজ করে।
সফরের সময় জার্মান পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অস্পিগ জিএমবিএইচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থমাস ক্যোনিং বলেন, ‘উদীয়মান বাজার হিসেবে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ম্যাক্রোইকোনমিক তথ্য ও উপকরণগুলো ব্যাপক সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’ আলমুট রোসনার, ওএভির নির্বাহী বোর্ডের সদস্য, সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন যে এটি ছিল তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ স্থাপন এবং বাংলাদেশের সংস্কার নীতি ও বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রদান করার একটি সুযোগ।
জার্মানি ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালে তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো (৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার)। জার্মানি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজার এবং বাংলাদেশের রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি বস্ত্রপণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই দেশে রপ্তানি হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ জার্মানি থেকে যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রী আমদানি করে।
পোশাক এবং চামড়াজাত পণ্য খাতে বেশ কিছু জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের উৎপাদন কারখানা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে থমাস ক্যোনিংয়ের কোম্পানি অস্পিগ কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়োগ করে জিনস ও জ্যাকেট উৎপাদন করছে। এছাড়া, পিকার্ড, একটি বাংলাদেশ-জার্মান যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি, ১৯৯৫ সাল থেকে চামড়াজাত হ্যান্ডব্যাগ এবং আনুষঙ্গিক পণ্য তৈরি করছে। আরও একটি উদাহরণ হলো হানা সিস্টেম লিমিটেড, যা বাংলাদেশের মেঘনা গ্রুপের সহযোগিতায় কিউব তৈরির কাজ করছে। বর্তমানে প্রায় ৮০টি জার্মান কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে বাসফ, বায়ার, বশ এবং সিমেন্সের মতো বহুজাতিক কোম্পানিও রয়েছে।
এই সফর এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন বিশ্ব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আক্রমণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা পুনর্গঠনের প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। ট্রাম্প ২ এপ্রিল বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করেন, যদিও বেশিরভাগ বাণিজ্যিক অংশীদারদের জন্য ৯০ দিনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে এই নীতির কারণে বাংলাদেশি সরবরাহকারী এবং তাদের অর্ডারের ওপর প্রভাব পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতটি বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন করে। বর্তমানে, এই শিল্প পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ক্যোনিং বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীনের ওপর উচ্চ মার্কিন শুল্ক জার্মান কোম্পানিগুলোকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র অনুসন্ধানে উৎসাহিত করছে। তিনি বলেন, ‘বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অতিরিক্ত শুল্কের কারণে বাংলাদেশ ভোগ্যপণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস ও অন্যান্য শিল্পপণ্য উপাদানে চীনের বিকল্প হিসেবে সম্ভাবনা রাখে।’ পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ থিংক ট্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ ক্যোনিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য এক প্রজন্মে একবারের সুযোগ।’ তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানান পুরোনো নিয়মকানুন, বাণিজ্য লজিস্টিক দুর্বলতা এবং উৎপাদনশীলতা উন্নত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার।
তবে বিনিয়োগকারীদের কিছু সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎসংকট, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং দুর্নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জার্মান বিনিয়োগকারীরা এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতন। ক্যোনিং উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বেশ উন্নত হয়েছে এবং তিনি মনে করেন, পোশাক খাতে বাংলাদেশের সাফল্য প্রমাণ করে, দেশটি অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রেও সাফল্য অর্জন করতে পারবে। ওএভির রোসনার বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বিনিয়োগকারীরা এসব বিষয়ে সতর্ক আছেন, তবে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল।


