১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৪০-এর দশকের গোড়ার দিকে সময়কালে, কাজী নজরুল ইসলামের নির্ভীক ও স্পষ্ট অবস্থান তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি করে তোলে। ১৯২৯ সালে ৩০ বছর বয়সে তিনি কলকাতার অ্যালবার্ট হলে এক গণসংবর্ধনা লাভ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৬৮ বছর বয়সে জীবনের শেষ পর্বে পৌঁছেছেন। এর আগেই নজরুলের আইকনিক কবিতা ‘বিদ্রোহী’ পাঠকের মাঝে মানবিকতার এক অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করেছিল।সেই অনুষ্ঠানে নজরুল তাঁর অনুরাগীদের উদ্দেশে সংকীর্ণতা ও গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে ভাবতে আহ্বান জানান। সেই মুহূর্তে তিনি যেন এক দুর্বার কবিচেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।
অ্যালবার্ট হলের দর্শকরা নজরুলের মাঝে এক উজ্জ্বল ও সংবেদনশীল আত্মাকে খুঁজে পান, এমন বৈশিষ্ট্য খুব কম কবির মাঝেই পাওয়া যায়। নজরুলের মতো সৃষ্টিশীল উদ্দীপনা আর খুব কমজনেরই ছিল। তখন ঠাকুর গভীর ধ্যানে নিমগ্ন এক বিশ্বশান্তির সন্ধানে। দুজনেই মানুষকে ভালোবাসতেন, তবে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা ছিল আধ্যাত্মিক ও প্রতীকধর্মী; নজরুল ছিলেন সরাসরি মানব মর্যাদা নিয়ে অকপট। সাধারণ মানুষের প্রতি নজরুলের দরদের যে গভীরতা, তা তাঁকে গণমানুষের কবি করে তোলে।
১৯২১ সালের শেষ সপ্তাহে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে নজরুল এক রাতেই লিখে ফেলেন ১৩৯ পঙ্ক্তির সেই ঐতিহাসিক ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ইংরেজি সাহিত্যে উইলিয়াম ব্লেকের কিছু অনুপ্রাণিত কবিতা থাকলেও, এভাবে দীর্ঘ একটি কবিতা একসাথে রচনার নজির নজরুলই প্রথম স্থাপন করেন। ছন্দ, তাল, রাগ-মিশ্র সুরের সম্মিলনে রচিত এই কবিতা বাংলা কবিতার জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
১৯২২ সালের জানুয়ারিতে সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় প্রথম ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয়। এরপর মুসলিম ভারত, প্রবাসী ও ধূমকেতু পত্রিকায় ছাপা হয়।ব্রিটিশ সরকার কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহ মনে করে নজরুলের বই ‘অগ্নিবীণা’ নিষিদ্ধ করে দেয়। তাঁকে কারাবন্দী করা হয়, যেখানে তিনি অনশন শুরু করেন।বাঙালি জনতা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও চুপ থাকেননি; নজরুলকে একটি টেলিগ্রাম পাঠান—“অনশন ভঙ্গ করো, বাঙালি পাঠক তোমায় মুক্ত দেখতে চায়।” নজরুল অনশন ভাঙেন, কিন্তু বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুদিন থেকেই যায়।
নজরুলের জীবনে দারিদ্র্য ছিল এক নিরবিচ্ছিন্ন সঙ্গী। তবে হঠাৎ করেই তিনি তাঁর লেখালেখি ও গান থেকে রয়েেলটি পেয়ে একটি গাড়ি কিনে ফেলেন। গাড়ি কেনা ছিল আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রতীক। কিন্তু টাকাভাবের কারণে দ্রুতই তাঁকে গাড়িটি বিক্রি করে দিতে হয়। তাঁর ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল সময় ছিল রঙিন, দুঃসাহসিক আর উদারভাবে উদযাপিত। লেখার সময় তিনি এক নির্জন সাধকের মতো নিবিষ্ট হয়ে যেতেন।
নজরুল শুধু কবিতাই লেখেননি, বরং গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, শিশুতোষ পদ্য, সিনেমার চিত্রনাট্য, এমনকি পত্রিকা সম্পাদনাও করেছেন।তাঁর জনপ্রিয় পত্রিকাগুলোর মধ্যে ছিল নবযুগ, ধূমকেতু, লাঙল। অসুস্থ হওয়ার আগের সময় (১৯২০-৪২) পর্যন্ত তিনি ২২টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।এছাড়া আরবি ও ফারসি থেকে অনুবাদ করেন ‘আমপারা’ এবং হাফিজের রুবাই। তাঁর গান যেমন বিপ্লবী গণসংগীত, তেমনই প্রেমের গান সবেতেই ভারতীয় রাগসঙ্গীতের প্রভাব ছিল প্রকট। তাঁর গানে আরবি ও ফারসি শব্দের ব্যবহার এবং রাগভিত্তিক সুর তাঁকে অনন্য করে তোলে।
নজরুলের অনেক গান রবীন্দ্রনাথের গানের মতোই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন পেয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর, ১৯৭২ সালে তাঁকে জাতীয় কবি হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি তাঁর প্রতি এক যথার্থ সম্মান। তাঁর সাহিত্যকর্ম ও কণ্ঠস্বর বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম রূপকার হয়ে আজও জীবন্ত।


